Sunday, 23 August 2020

||অভিমান||

-- "মোটা ধুমসি মাগি! এক্কেয়ারে নচ্চার মেয়েছেলে। লজ্জা করে না, আপিসের নাম করে রোজ রোজ, রাত করে করে বাড়ি ফিরিস?"

ঘড়িতে ৯.২০। আর আমার দাঁড়িয়ে থেকে ঝগড়া করার সময় বা ইচ্ছে কোনও টাই  নেই। এর পর দেরি করলে মর্নিং মিটিং মিস করবো। তা ছাড়া, ডিভোর্সের পর থেকেই এই রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়ে, পরিবার হোক বা প্রতিবেশি, সকলেই বিষয়টা অনুবিক্ষণ যন্ত্রের নীচে ফেলে কাটা-ছেঁড়া করে আমার ব্যাপারে নিজের মনের মতো এক-একখান আস্ত পান্ডুলিপি তৈরি করে ফেলেছে। একমাত্র এই মানুষটাই আমাকে তুলোর মতো আগলে রাখতো, সবার অলক্ষ্যে ফেলা চোখের জল মুছিয়ে দিতো।
--"কিন্তু যেদিন থেকে সৌম্য আমার জীবনে এসেছে, সেদিন থেকে তুমিও সবার মতো হয়ে গেছো। "
চোখ আর ছলছল করেনা; শুকনো মরুভূমি হয়ে গেছে। সব কথার উত্তরও আর দিতে ইচ্ছে করে না। ভীতরের অন্ধকূপটার ব্যাস দিনদিন শুধু বেড়েই চলেছে।

আজও সারে ন'টার আগে বেড়োতে পারলাম না।প্রশান্ত্ আমার বানানো রেভিনিউ  এক্সপ্যানশন মডেল চোখের সামনে নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে সিইও-র কাছে নাম কুড়োলো। বিষয়টা আমি কিছুতেই গিলে নিতে পারছিলাম না। মেইল টা আমাকে সিইও কে করতেই হতো। এই প্রথমবার সিইওকে লেখা কোনও মেইলে আমি প্রশান্ত্ কে মার্ক করলাম না।

বাড়ি ঢুকে দেখি ঘরটা অন্ধকার। পাখার আওয়াজ পেলাম। দরজা খোলার শব্দ পেয়েও আমায় সারা দিলো না। মনে মনে ভাবলাম, "অভিমান করা তোমার বাপের একার সম্পত্তি নয়।" আর ও একটু বেশি আওয়াজ করে, জানান দেওয়ার জন্যই, ও ঘরে না গিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে এলাম।

মনে হলো যেন এক ঘুমেই সকাল হলো। রাতের খাবার চাপা দিয়ে এখনও টেবিলেই পড়ে আছে। ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে অভ্যাস মতো নীচে জলের বোতল টা দিতে গেলাম। মাপের জল তো, সারাদিনে মাত্র ৭৫০ ml খেতে পারবে। জৈষ্ঠ্য মাসের জ্বলন্ত আবহাওয়ায় ঐ টুকু জলে কি হয়! উপায় তো নেই। তাও কি চুরি করে খায়না? কতদিন হাতেনাতে ধরেছি, কুঁজো থেকে জল চুরি করে খাচ্ছে। তারপর আবার এক প্রস্থ অশান্তি। নীচে এসে আজ একটু অন্যরকম লাগলো। এতো বেলা অবধি তো শুয়ে থাকে না। আমার নাহয় শনিবার, ছুটির দিন। ডাকতে গিয়ে কপালে হাত দিয়ে দেখলাম গা বেশ গরম। তাড়াতাড়ি উইলচেয়ার-টয়লেট টা চেক করলাম, এক্কেবারে শুকনো খটখটে। বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। আর সাড়া না পেয়ে, অ্যাম্বুলেন্স ডাকলাম।

সাড়ে চার ফুটের ফর্সা চেহারাটা আইসিইউ ওয়ার্ডের বেডে শুকিয়ে যেন আরও ছোটো হয়ে গেছে। ডাক্তার আমাকে কোনও কিছুই স্পষ্ট করে বলতে পারলেন না। শুধু এটুকু বুঝলাম ক্যানসারটা আর কেবলমাত্র কিডনিতেই সীমাবদ্ধ নেই। উনি বললেন, সোডিয়াম-পটাসিয়াম লেভেলটা রেঞ্জের বাইরে চলে গিয়েছিল। তাতে নাকি মানুষের মতিভ্রমের মতো কঠোর রোগও হতে পারে এবং ফলাফলস্বরূপ কেউ কেউ কটুকাটব্যও করতে পারে।  ।
-"আপনি তিন ঘন্টা পরে এসে রেজিস্টারে সই করে 'বডিটা' নিয়ে নিতে পারবেন।"
কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমার সেই আদরের দিদা কি করে যেন একটা "বডি"তে পরিণত হয়ে গেলো। অনেক কথা বলা বাকি রয়ে গেল। অনুভূব করলাম, অভিমানটাকে আমি কেমন করে সেদিন রাতে আমার বাপের একার সম্পত্তি ভেবে  নিয়েছিলাম! 

No comments:

Post a Comment