Thursday, 17 September 2020

||হনিমুন||

তথাগত- ও বাবাহ। খুব মন দিয়ে প্যাকিং চলছে দেখছি!
সুপর্না- আরে:, তুমি কখন এলে? ডাকোনিতো। 
তথাগত-(জড়িয়ে ধরে) পিছন থেকে তোমায় দেখছিলাম।কেমন বড় বড় স্যুটকেস একাই হ্যান্ডেল করো। মুনসঙের হোটেলেও তো তোমায় আমাকে একাই হ্যান্ডেল করতে হবে... তাই ভাবছিলাম.. 
সুপর্না- ইসস। কিছুই মুখে আটকায়না, না? বিয়ের দেখা শোনার সময় বাবা বলেছিল ভী-ষ-ণ ভদ্র! ভদ্রতার নমুনা যদি একবার বাবা দেখতো! 
তথাগত- দেখলে বুঝি বিয়ে টা ভেঙে যেতো? আর প্রথম যেদিন তোমাদের বাড়িতে তোমায় দেখতে গেলাম, সেদিন তো খুব আমায় দেখে মুচকি মুচকি হাসছিলে। তার বেলা? 
সুপর্না- তা কী করবো? সামনে সাজিয়ে রাখা মিষ্টি পান্তুয়া ছেড়ে, বাবু যদি শুধু আমাকেই দেখেন, সেটা কি আমার দোষ? 
তথাগত-নাহ।আমার দোষ।অ্যাই শোনো না, ঐ স্লিভলেস টপটা নিয়েছোতো? ঐ রিসর্ট টা কিন্তু দারুণ রোমান্টিক প্লেস। 

(পাশের ঘর থেকে মার গলা) 
অ্যাই বাবু তোদের হোলো? আর কতো দেরি করবি? কাল ভোরে তো ট্রেন। খেয়েনে তোরা। 
( সুপর্না হেসে উত্তর দেয়) 
- হেহে, বেশ হয়েছে এবার। 

তথাগত আর সুপর্নার সবে দশদিন হলো বিয়ে হয়েছে। খবরের কাগজ দেখে সম্বন্ধ করেই বিয়ে। তবে সম্বন্ধ করে বিয়ে হলেও, বিরিয়ানি থেকে পাহাড়, দুজনের পছন্দ গুলো দুজনের সাথেই হুবহু মিলে যায়। যাকে বলে এক্কেবারে মোস্ট কমপ্যাটিবল কাপল। পরিবারে বিয়েবাড়ির রেশ কাটতে না কাটতেই, দুজনে একসাথে হনিমুন কাটাতে গেলো, দার্জিলিং ডিস্ট্রিক্টে মুনসঙ নামে একটি উঠতি পাহাড়িয়া গ্রামে।

দার্জিলিং মেল একদম রাইট টাইমে ঢুকে গেছে NJP ; সেখান থেকে সারে তিন ঘন্টা লাগলো রিসর্টে পৌঁছতে। তথাগত নববধূর মন জয় করতে পাহাড়ের কোলে একটা দুর্দান্ত রিসর্ট বুক করেছে। একদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বুকে সূর্যদয়, আর মাথা নীচু করলেই তিস্তা নদীর অপূর্ব ভিউ। রিসর্ট এর চারিদিকে এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে আছে কত রকমের পাহাড়ি ফুল। গাড়ি থেকে নেমেই, সুপর্না অপরূপ পাহাড়ি সৌন্দর্যকে মোবাইল ক্যামেরায় বন্দী করতে লাগলো। আর অন্যদিকে তথাগত রিসেপশনে বসে রিসর্টের বেসিক ফর্মালিটিস কমপ্লিট করতে লাগল। 

-Sir, I once more confirm, your booking is from 25th to 30th July. As a premium booking, you get the Himalayan cottage, you can enjoy your tea with the mesmerizing Sunrise and a wonderful balcony view of Tista. Apart from that you can enjoy our luxurious gym, bar and massage parlors. Here are your keys.. Your room number is 205.
- Thank you

 -কি ম্যাডাম! পছন্দ? 
- পছন্দ মা-নে??দা-রু-ণ। তথাগত এই হনিমুন টা আমি কোনওদিন ও ভুলবোনা। রিসর্ট টা কি দারুণ না? 
- মমমম.. বলেছিলাম না? আর এদের এখানকার পর্ক স্টেক জাস্ট অওসাম! অনেক রিসার্চ করতে হয়েছে ম্যাডাম। খরচা আছে বলে দিলাম! 
- এখন সব ধারে চলুক। পরে হিসেব মেলাবো। 
( সুপর্না - তথাগত দুজনেই হেসে ওঠে) 

নবদম্পতি প্রেমে এক্কেবারে হাবুডুবু। আর রিসর্ট এর সৌন্দর্য তো উপরি পাওনা। রডোডেনড্রনরা সারা রিসর্ট টাকে যেন পাহাড়া দিচ্ছে। 

আজকের দিনটা মোটামুটি রেস্ট নিয়েই কেটে গেলো। তথাগত ব্যলকনিতে রিল্যাক্স করছে। সুপর্না ফ্রেশ হয়ে সেই পার্পল স্লিভলেস টপটা পরে, তথাগতর কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো।পাহাড়ের পাথুরে গন্ধকেও হাড় মানাচ্ছে সুপর্নার ইম্পোর্টেড পারফিউম। পাহাড়ের বিকেলে তখন ধিরে ধিরে নিঝুম অন্ধকারও গা এলাচ্ছে। তথাগত হাত থেকে উইস্কির গ্লাসটা সামনের টেবিলে রেখে, পৌলমীকে বলল, 
- (নাক দিয়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিয়ে), আহ, তুমি তো দেখছি আজকেই শেষ করে দেবে আমাকে! 
- মশাই, তার আগে তোমার গ্লাসের ঐ তরল পদার্থ খানি তোমাকে শেষ করে দেবে। 
- উফ, তোমার সাথে কথায় আমি পারবোনা। 
- হাহা,আরও অনেক কিছু তেই পারবেনা ডার্লিং। 
- তাই! কৈ দেখাও। একটু পরাস্ত করে দেখাও। শুনেছি, স্ত্রীর কাছে স্বামীরা নাকি পরাস্ত হলে, তার অনুভূতি টা completely incomparable! 
- নাকি? 
-হ্যাকি! 
- তোমার কথায় নেচে এই স্লিভলেস টা পড়ে আমার খুব ঠান্ডা লাগছে। ভীতরে চলো না! 
- আর just দু পেগ খাবো। সত্যিই বলছি। তারপর তোমায় কে ঠান্ডা লাগায়.... আমি দেখছি।
- (haha)ধ্যাত! অসভ্য।
( উত্তরে তথাগত এক কলি গান গায় - "আমার এই বাজে স্বভাব..") 
- উফ, তোমার এই গান... Just killing!! 
- (হেসে) আচ্ছা, আচ্ছা, তুমি যাও,এবার সত্যিই ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি আসছি। 

 সুপর্না কানে হেডফোনটা গুঁজে খাটে একটা বালিশ টেনে হেলান দিয়ে সবে বসতে যাবে, হঠাৎ একটা চার ভাঁজ করা কাগজ, খাটের কাঠের ফ্রেমটা থেকে যেন বেড়িয়ে এলো। অবাক হয়ে কাগজের ভাঁজ খুলতেই, মনে হলো এ যেন কার চিঠি। বেশ কৌতুহল নিয়েই সুপর্না চিঠিটা পড়তে লাগল। 

"কি তথাগত, ভালো আছো এখন? মনের চাপ টা নিশ্চই কমেছে? আগের মতো আর গান গাও? আর এখনও বুঝি কথায় কথায় সেই দুষ্টুমি...থাক, ছাড়ো। চিনতে পারছো আমায়? আমি, তিস্তা। তোমার রাতজাগা জলপ্রপাত! 
জানো, এখন রাত ঠিক ২.৪৫.. তোমার মনে পড়ে, মুনসঙের সেই রাতটা? ঠিক এরকমই আর একটা ২.৪৫...তোমার বন্য আদরে ভরে গিয়েছিল হিল সাইট রিসর্টের এই 205 নম্বর রুমটা। 

   আচ্ছা, এখানকার পাহাড়ের পূর্নিমা চাঁদের কথা মনে পড়ে তোমার? ব্যলকনিতে দাড়িয়ে ঐ চাঁদনী আলোতে কতোবার যে আমাকে পাগলের মতো "ভালোবাসি তোমাকে" বলেছো, সাথে অন দ্য রক্স...আমার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়েছো তোমার চুমুতে বারবার...fire place এর আগুন টা ধিকধিক করে জ্বলেছে সারা রাত, সারাটা শরীর মন জুড়ে...
তথাগত, জানো, আমি আজও পাহাড়ে... আজও সেই 25সে জুলাই, সেই পাহাড়ের পূর্নিমা চাঁদ, সেই পাইনের শিরশিরানি হাওয়া, রাতজাগা পাখির ডানা ঝাপটানো, সবটাই এক ই আছে, শুধু, তুমি নেই, তোমার দেওয়া কথারা নেই, তোমার গানের সুরের উষ্ণতা নেই,  
আর আমি..."
(চিঠি পড়ার মাঝখানেই তথাগতর গলার আওয়াজ শোনা যায়) 
- এই সুপর্না তাড়াতাড়ি একবার ব্যলকনিতে এসো। তিস্তাটা চাঁদের আলোয় কি ভালো লাগছে দেখবে এসো! 
- (ভেতর থেকে ক্রন্দন সিক্ত গলায় সুপর্না উত্তর দেয়) আমিও তো তিস্তাকেই দেখছি। মনে হচ্ছে চাঁদের এ-ক-দ-ম কাছে আছে। 

(গান : লালন সঙ বাই ঝিমলি) 

No comments:

Post a Comment