Wednesday, 5 August 2020

||হাতবদল||

বাবা-মার উপর বরাবরের রাগ তাতানের। কৈ তারা দিদির উপর তো নিজেদের ইচ্ছে গুলো চাপিয়ে দেয়না! শুধু ছেলে বলে বুঝি এতো দায়িত্বের বোঝ নিতে হবে! এই ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ারের ভবিষ্যতের বাইরে যেন আর কোনও ভবিষ্যৎ ই নেই ওদের কদরে। মাধ্যমিকে ইতিহাসে পঁচানব্বই পাওয়া স্বত্ত্বেও নিজের ছোটোবেলা থেকে দেখা আর্কিওলজিস্ট হওয়ার স্বপ্নকে চোখের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে তাতান। মুখ ফুটে সেদিন রা শব্দটা পর্যন্ত কাটেনি তাতান। বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস তাতানের যে একেবারেই নেই। বাবার গম্ভীর মুখটা দেখলেই মনের ইচ্ছে গুলোও তাতানের সাথে চোর পুলিশ খেলে। আর এদের মাথা থেকে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান এর ভূত নামানোই গেলোনা। ছেলেরা নাকি আর্টস পড়েনা। বাবা-মার এই অতিরিক্ত চাপে তাতানের শ্বাসরোধ হয়ে আসে প্রতি মুহূর্তে। এখন আবার নতুন বায়না, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেই হবে। কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে একদিন সবে বাবাকে বলতে গেলো যে সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায়না, ব্যস, অমনি শুরু হয়ে গেলো বাবার গর্জন... 
-- মনি, তুমি তোমার ছেলে কে বলে দাও এসব বেড়েল্লাপনা এখানে চলবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং ওকে পড়তেই হবে। 
-- উফ! তোমাদের এই বাপ-ছেলের প্রতিদিনের কুরুক্ষেত্র আমার আর ভাল্লাগে না বাপু! বাবু, তোর কি বাবা মার জন্য একটুও খারাপ লাগেনা কখনো? রোজ তোর বাবা, মুখে দুমুঠো গুঁজে ছোটে অপিসে। মানুষটার কথা কি একবার ও ভাববিনা? 
তাতান ভাবে, এদের কিছুতেই বোঝানো যায় না, ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়লেও মানুষ বাঁচে। তাছাড়া, স্ট্যাটিস্টিক্সই যে আগামী দিনের শিরদাঁড়া, সেই বা কে এই বাড়িতে শুনবে। ইলেভেন থেকেই বাগ স্যারের ক্লাসে এই স্ট্যাটিস্টিক্স এর প্রথম প্রেমে পড়া। তাতান এবারে এক্কেবারে decided, আর তার সাধের হাতবদল হতে দেবেনা সে। H. S. পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেরদিন, দিদির কাছে সন্ধ্যেবেলা ছাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক নালিশ করলো। গোটা বাড়িতে এই একটা মানুষ ই যে তাতানকে এতো বোঝে। 
--"আচ্ছা ঠিকাছে বাবা, এখন শান্ত 'হ। কাল প্রথম পরীক্ষা। এই মাথাগরম নিয়ে পরীক্ষা দিলে তো তোর স্ট্যাটিস্টিক্স ও কিস্যু করতে পারবে না। 
---দিদি আমি মরে যাচ্ছি ভিতরে। পারছি না নিতে এতো চাপ। 
--- ওরে পাগল। চুপ করবি? চোখ মোছ, এদিকে আয়...  উফ! কবে বড় হবি তুই? হসপিটাল থেকে তোকে বাবা যেদিন সেই আঠেরো বছর আগে নিয়ে এসছিল, সেদিন ও তুই এতো কাঁদিসনি। 

দুমাস কেটে গেছে। তাতান সকাল থেকেই প্রচন্ড উত্তেজিত। আর কিছুক্ষণ পরেই জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোবে। দিদি ঘরে ঢুকে দেখলো, তাতান হাতের নোখ গুলো খেয়ে প্রায় শেষ করে ফেলেছে। 
-- কিরে গরু! তুই তো এমনিতেও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বিনা। তাহলে আবার এতো টেনশন কিসের? 
-- ওফ! ঝামেলা পাকাস নাতো দিদি। 
- হা হা হা হা, শোন ভাই..বাবা মা তোর ভালোই চায় বুঝলি? 

রোল নম্বর টা কম্পিউটারে টাইপ করার সময় হাত কাঁপছে তাতানের। চোখ ছলছল। বুক দুরদুর। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠল রেজাল্ট। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পরতে লাগলো। দিদি পাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল, "সাবাশ!! ভা-আ-ই...৩২৬ !!" পেরেছে অবশেষে তাতান। চোখ ভরা জল নিয়ে বই এর ভিতর থেকে জেভিয়ার্স কলেজের ফর্ম টা নিয়ে গেলো বাবার কাছে। ফর্ম টা বাবার হাতে দিয়ে বলল, ৩২৬। তাতানের বাবা  TV তে খবর শুনছিল। মুখ সরিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এটা কি?"
- স্ট্যাটিস্টিক্স থ্রি ইয়ার্স ডিগ্রী কোর্সের ভর্তির ফর্ম। এখন আর নিশ্চয়ই লোকে কি বলবে সেই ভয় নেই! আর এখনও ভয় থাকলে, আমার জয়েন্টের রেঙ্ক টা জানিয়ে দিও তোমার দেশোদ্ধার করা পাড়া-প্রতিবেশিদের। ফর্মে সাইনটা করে রেখো। কালই জমা দিতে হবে। 

No comments:

Post a Comment