Wednesday, 5 August 2020

||ভেলভেলেটা||

অতিন্দ্র। সালটা 2001 কি 2 হবে। আমাদের থেকে বছর পাঁচেক ছোটো। তখন বোধহয় "অতি" রা ক্লাস সেভেন টেভেনে পড়ে। হ্যাঁ, অতি। ঐ নামেই ওর বন্ধুরা ওকে ডাকতো।  রোজ বিকেল বেলা আমাদের যাদবপুরের ভাড়া বাড়ির সামনে যে ফাঁকা গলিটা, ওখানে পাঁচ ছ' জন বন্ধু মিলে খেলতো। ঐ সময়টা আমি আমার দিদার পায়ে তেল মালিশ করে দিতাম। দিদা সবসময় বলত, 
- "এই ছেলেটা বড় নচ্চার।  ও আবার কি চলনধরন! পাড়া-প্রেতিবেশিদের বাঁচতে দেবে না গা। ছেলে হয়ে জন্মেছিস, কোথায় বংশের বাতি ধরবি, তা না মেয়েলি পনা। আজকাল, দিনকাল বাপু বুঝিনা... "
এক মাথা কোঁকড়ানো চুল, শান্ত স্বভাবের অতিন্দ্র, বেশিরভাগ সময়ই মুখ নীচু করে থাকতো। আসলে, অতির আদব কায়দা আর পাঁচ টা ছেলের মতো তো ছিলনা। চোখে পড়ার মতো বেশ আলাদাই ছিল। কোমর দুলিয়ে হাঁটতো, হাতের ভঙ্গিমাও অনেক তাবর তাবর নৃত্য শিল্পীদের মতো, গলার স্বর ও বাকিদের মতো তখনও পুরুষালি হয়ে ওঠেনি। ওর হাত থেকে বল্ ফসকে গেলেই, ওর বন্ধুরা ওকে "এই মেয়েটা, ভেলভেলেটা" বলে খুব জ্বালাতো। তাও কখনোও অতিকে মুখ খুলতে দেখিনি। বরং মুখ নীচু করে চোখ মুছতে দেখেছি। অনেক সময়ই মনে হয়েছে তাড়াতাড়ি নীচে দৌড়ে গিয়ে, দিদির মতো পাশে দাঁড়াই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, এতো অতির ই দোষ!  ও তো চাইলেই পারে নিজেকে একটু বদলে নিতে। 

একটু বড় হওয়ার পর হঠাৎ একদিন শুনেছিলাম ওর বাবা নাকি ওকে খুব মেরেছে, সে কি চিল্লাচিল্লি। ছেলেটা নাকি ওর বোনের শাড়ি পড়ে বিয়ের কোনে বৌ সাজছিল, আর অমন সময় ঘরে ঢুকে পড়েছে ওর বাবা। তারপর চ্যালাকাঠ দিয়ে মার। আমার এখনও মনে আছে সেদিন সারা দুপুর থেকে সন্ধ্যে আমাদের বাড়ির পিছনের মাঠের মাঝখানে ওর বাবা ওকে খালি গায়ে, শুধু একটা জাঙ্গীয়া পড়িয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। আর স্কুল ফিরতি যত ছেলেপুলে ওর গায়ে রাস্তা থেকে ঢিল কুড়িয়ে মারছিল। আমি আর বিনু, মানে আমার ছোট বোন, ওকে দেখে সেদিন খুব হাসাহাসি করেছিলাম। বিনু তো হাসতে হাসতে বলেও দিলো, দিদি, তুই আমাকে তোর মাধ্যমিকে পাওয়া ঘড়িটা দিয়ে দিলেও ওকে কক্ষনো বিয়ে করবোনা! তারপর শুনেছিলাম অতি নাকি বাঙ্গুরে দুদিন ভর্তি ও ছিল। অত বড় একটা ছেলে, নিজেকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল পুরো শরীর টা ঢাকা দেওয়ার। আর তার সাথে সে কি কান্না! তার কয়েক মাস পরই কানা ঘুষো শুনেছিলাম ওকে নাকি পুরুলিয়াতে কি একটা বয়েজ রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেই কথাটা শুনে দিদা মাকে বলেছিল, "যাক বাবা। ছেলেটার এবার একটা হিল্লে হবে। কথায় আচে, ভগোবান আচেন। সেকি আর এমনি এমনি বলে নাকি গা! "

 যাইহোক, আজ মা'কে নিয়ে monthly check up এ যেমন যাই, তেমন গিয়েছিলাম হসপিটালে। ড: সরকারের কাছে।কদিন ধরেই মা'র প্রেসার টা খুব ওঠানামা করছে। পাল্স টাও বেশ হাই। কিন্তু এবারে ড: সরকারের কথা মোটেই ভালো ঠেকলো না। প্রেশার এর আগে সুগারের রিপোর্ট টা কন্ট্রোল না হলে, অ্যাঞ্জিও টা পর্যন্ত করা যাবেনা। ডাক্তার বাবুর প্রেস্ক্রাইব্ড মেডিসিন নিয়েও সুগারের লাস্ট রিপোর্ট টা ওনার নিজেরই মন মত হয়নি। 

- নাহ, পারমিতা, তোমার মার ওপর আর এক্সপেরিমেন্ট করাটা ঠিক হবেনা। আমার মেডিসিন গুলো মোটেই কাজ করছে না। সে তোমরা আমাকে যতই ভগবান বলো! 
- কিন্তু স্যার, মাতো খাওয়া দাওয়াও আগের থেকে অনেক কন্ট্রোল...
- শুধু কন্ট্রোল করলেই হবে না পারমিতা। রেগুলার ডিটেল্ড মনিটরিং লাগবে। আমি একজন এন্ডোক্রোনোলজিস্ট কে রেফার করে দিচ্ছি। ওনার কাছে এখনও অবধি আমি যাকে যাকে পাঠিয়েছি, সবাই খুব success পেয়েছে।  অতশী is a very serious doctor...তুমি দাঁড়াও, আমি reception  এ বলে দিচ্ছি ফোন করে।
(ফোন তুলে) হ্যাঁ, এই মিলি, শোনো, আমার ঘরে এখন যে পেসেন্ট আছেন ওনাদের আমি একটু ড: মিত্র কে refer করেছি, ওনাদের ম্যাডামের ঘরে কাউকে দিয়ে একটু পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দাও না... Ok. Thank you. 
হ্যাঁ, তোমরা বাইরে মিলির কাছে যাও, ও সব ব্যবস্থা করে দেবে। just don't worry. 

আমরা রুম থেকে বাইরে বেরোতেই রিসেপশনের ঐ মিলি বলে মেয়েটি নিজেই আমাদের দোতলায় মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে নিয়ে গেল। দু নম্বর ঘরের দরজায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা "ড: অতশী মিত্র"... নাম টা দেখেই মনে অনেকটা বল পেলাম। মিলি কে জিগেস করলাম,  "ম্যাডাম কি এম ডি?" 
- ড: মিত্র এখানকার Head of the Department
শুনেই ভরসার মাত্রা টা আরো খানিকটা বেড়ে গেলো। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই আমাদের ডাক পরল। বুঝলাম, ড: সরকার ওনাকে আগেই inform করে দিয়েছেন। নাহলে ওনার ঘরের বাইরে যা ভিড়... 
ঘরে ঢুকতেই, এক মুখ তরতাজা হাসিতে জ্বলজ্বল করছে একটা চকচকে চেহারা; ঘাড় অবধি চুলে চাইনিজ কাট করা, চোখে চশমা, পরিপাটি ভ্রূ, মসৃণ গোলাপি ঠোঁট, হাতের নিখুঁত আঙুল...এত স্নীগ্ধতা, সামনে না থাকলে বোঝানো সম্ভব নয়। 
একটু অধৈর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, 
- ম্যাডাম, মানে, কিছু যদি না মনে করেন... আপনি কি...অতিন্দ্র বলে কাউকে চেনেন? যাদবপুরে থাক... 
- হ্যাঁ মিষ্টি দিদি, আমি তোমাদের সবার সেই ছোট্ট অতি। আর বাকিদের কাছে ড: অতশী মিত্র।

No comments:

Post a Comment