19th December, 2019 (রাত আড়াইটে)
আমি রূপজা। কর্মসূত্রে সিঙ্গাপুরে থাকি। প্রায় পাঁচ বছর পর কলকাতা আসছি। কলকাতায় ফেরার ইমোশন টা এখনও একই রকম। ভীষণ টাটকা। সেই চেনা ভিড়ে বারবার মিশে যাওয়ার আনন্দটা অনেকটা কাউকে ভাগ না দিয়ে সমুদ্রের ধারে সূর্যাস্ত দেখার মতো। শহরটা প্রতিদিন বুড়ো হলেও, জেল্লাখানা এক্কেবারে সেই একই আদব কায়দায় ধরে রেখেছে। প্রতি বার প্লেনটা যখন এই মাঝরাতে এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করার জন্য মুখ নিচু করে, মনে হয় যেন হাজার হাজার নক্ষত্রে সাজানো রূপ সাগরে ডুব দিতে প্রস্তুত হচ্ছে।
মোবাইল ফোন টা সুইচ অন করে লাগেজ বেল্টে অপেক্ষা করছি, এমন সময় পিছন থেকে খুব পরিচিত একটা গলা ভেসে এলো কানে :
"দাঁড়াও দাঁড়াও, গাড়িটা বুক করতে দাও।" পিছন ঘুরে চোখ খুঁজে বেড় করার আগেই, নিস্বন খানি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো।
23rd December, 2019 (3.30 pm)
প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট হয়ে গেলো আমি একা একাই পিয়ালীর ঠাহর গুনছি। পিয়ালীর আর কোনও পাত্তা নেই। কলকাতা শীতের দুপুরের মিঠে রোদে দিব্যি দেখায়; মল এর কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে দৃষ্টি আঁটকানোর কোনও উপায় নেই।
ইতিমধ্যেই দুবার ফোন ও করে ফেলেছি।
" কিরে, আর কতো দেরি তোর?"
- "আরে বাবা আসছি, আসছি। কলকাতা শহরের রাস্তা-ঘাট তুই আর কি বুঝবি? তোদের মতো চারিদিকে স্মুদ ওভারব্রিজ তো আর নেই। এতদিন বাদে এসছিস, এই বুড়ো শহরটার ঘ্রাণ নে বুঝলি, ঘ্রাণ নে।" উপরি জ্ঞান দিয়ে, পিয়ালী ফোনটা কেটে দিলো। অগত্যা আবার আমার হাত গোনার পালা শুরু, কখন তিনি দেখা দেন!
আমি বুঝতে পারছিলাম, কফি শপের দোকানদার-লোকটা অনেকক্ষণ ধরে, আমাকে বেশ সিম্প্যাথী নিয়ে দেখছিলেন। দুটো কফি শেষ, এটা তিন নম্বর চলছে, এটাও প্রায় শেষের দিকে। ভদ্রলোক নির্ঘাত ভেবেছেন, প্রেমে লেঙ্গী খাওয়ার ফল! বন্ধু ও যে লেঙ্গী দেয়, সেটা তো আর ওনার জানার কথা নয়।
"মে আই শেয়ার প্লীজ?", এয়ারপোর্টে আবার খুঁজে পাওয়া সেই চেনা গলা! খুব অবাক হয়ে তাড়াতাড়ি কফি ছেড়ে, মাথা তুললাম,
" আরে.... তুই! এখানে? মানে কি করে?"
প্রচন্ড তাচ্ছিল্য ভরা হাসি হেসে বলল, "মানে টা কি বস? এটা আমার শহর। আমার যেখানে খুশি যাওয়ার রাইট আছে।"
-তা নিশ্চয়ই আছে; কিন্তু তোর তো আবার সাহেবিয়ানা বেশি পছন্দ কিনা! এখন কোথায়?
-ওরে, পাগলী। সব প্রশ্ন কি আমায় দাঁড় করিয়ে রেখেই করবি?
মনে মনে ভাবলাম, পাগলি বলে যে তুই আর কত্ত বছর ডাকিসনা, সে বোধহয় আমি নিজেও ভুলে গেছি। উত্তেজিত হয়ে বললাম,
-ওহ। অ্যাম সো সরিয়ে, প্লিজ বস...
-তারপর, ম্যাডাম কি এখানে শপিং?
-দুর শপিং। পিয়ালীকে মনে আছে তোর?
-পিয়ালী? বাংলা ডিপার্টমেন্ট? ওবাবা... ওকে মনে থাকবেনা? রেজাল্ট বেরোনোর দিন দু নম্বর কম বলে সে কি কান্না....
-হা হা হা হা। হমমম্! সেই পিয়ালীর জন্য ই অপেক্ষা করছি।
- ইউ মিন ডেটিং?
- মমম্। হা হা হা হা, কাইন্ড অফ... মমমম্ অ্যান্ড ইউ?
- আমিও ঐ! মমমম্ ডেটিং!
খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, সে কি আমার থেকে বেশি সুন্দর! একটু চুপ থেকে বললাম,
- ভালোই হল আজ তাহলে আলাপ টাও হয়ে যাবে।
-ফর সিওর। আরে এইইইই... তোর ঘড়ি টা সেই টা না?
বলেই হাত টা টেনে নিয়ে বলল, আরে এখনও এক ই রকম আছে তো! অবশ্য তোর যত্নের কাছে ভিন্টেজ ও হার মানবে।
-বাজে বকিসনা তো। ওসব আমার অবসেশন।
-কিন্তু দাঁড়া, দাঁড়া...পাগলি এটা কি? এতো চলে না। বন্ধ। এটা পড়েছিস কেন?
- তুই জোর করে সময়কে বন্ধ করে দিলেই বুঝি সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়? লাস্ট ফিফটিন ইয়ার্স, এটা আমার সাথে এভাবেই জড়িয়ে। সমস্ত কিছুর একমাত্র সঙ্গী। তুই সেদিন হাইয়ার স্টাডিজের জন্য ক্যানাডা চলে গেলি তোর দাদার কাছে, সাত পাঁচ ভাবিসনি।আমার কথা তো ভাবিসইনি। সেদিন সত্যিই মনে হয়েছিল সময়টা থমকে গেলো। সারাজীবনের মতো। সঙ্গী ছিল শুধু এই তোর দেওয়া ঘড়ি টা। পনেরো বছর ধরে, বারবার, ও আমাকে সেদিনের সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া মুহূর্ত টার খেয়াল করিয়ে দেয়।সুমন, তুই আমাদের সব গল্প ভুলে গেলেও আমার কাছে আজ ও সব টাটকা।
সুমন স্ফীত হাসি হেসে, পকেট থেকে মোবাইল ফোন টা বের করে একটা ফোন করতে লাগে। ওর এই আচরণ দেখে আমার খুব মনে হল, আমি বোধহয় একটু বেশিই ছেলেমানুষি করে ফেললাম।
-আরে তোমার আর কতো দেরি? আর কতো কি কিনবে? আমি ফুড কোর্টে, তুমি তাড়াতাড়ি আসো।
-সরি, আমি বোধহয় একটু বেশিই ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম, আই মিন...
-ইটস ওকে রূপ। তোর এগুলো বলার অধিকার আছে। আমিও সেদিন...
হেই সুমান। তুমি এখানে! দেখো কতো কি কিনেছি। আই জাস্ট লাভ দিস ম্যান।
একটু দূর থেকে, ফিনফিনে এক পুরুষ কন্ঠ ভেসে এলো।
- হি ইস মাই নেফিউ, সূর্য। ওয়েন হি ওয়াজ ফাইভ, দাদা বৌদি একটা অ্যাক্সিডেন্টে...
(দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে) সিন্স দেন আমার সাথেই। এই প্রথম ওর কলকাতা আসা।
আমি রূপজা। কর্মসূত্রে সিঙ্গাপুরে থাকি। প্রায় পাঁচ বছর পর কলকাতা আসছি। কলকাতায় ফেরার ইমোশন টা এখনও একই রকম। ভীষণ টাটকা। সেই চেনা ভিড়ে বারবার মিশে যাওয়ার আনন্দটা অনেকটা কাউকে ভাগ না দিয়ে সমুদ্রের ধারে সূর্যাস্ত দেখার মতো। শহরটা প্রতিদিন বুড়ো হলেও, জেল্লাখানা এক্কেবারে সেই একই আদব কায়দায় ধরে রেখেছে। প্রতি বার প্লেনটা যখন এই মাঝরাতে এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করার জন্য মুখ নিচু করে, মনে হয় যেন হাজার হাজার নক্ষত্রে সাজানো রূপ সাগরে ডুব দিতে প্রস্তুত হচ্ছে।
মোবাইল ফোন টা সুইচ অন করে লাগেজ বেল্টে অপেক্ষা করছি, এমন সময় পিছন থেকে খুব পরিচিত একটা গলা ভেসে এলো কানে :
"দাঁড়াও দাঁড়াও, গাড়িটা বুক করতে দাও।" পিছন ঘুরে চোখ খুঁজে বেড় করার আগেই, নিস্বন খানি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো।
23rd December, 2019 (3.30 pm)
প্রায় পঁয়ত্রিশ মিনিট হয়ে গেলো আমি একা একাই পিয়ালীর ঠাহর গুনছি। পিয়ালীর আর কোনও পাত্তা নেই। কলকাতা শীতের দুপুরের মিঠে রোদে দিব্যি দেখায়; মল এর কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে দৃষ্টি আঁটকানোর কোনও উপায় নেই।
ইতিমধ্যেই দুবার ফোন ও করে ফেলেছি।
" কিরে, আর কতো দেরি তোর?"
- "আরে বাবা আসছি, আসছি। কলকাতা শহরের রাস্তা-ঘাট তুই আর কি বুঝবি? তোদের মতো চারিদিকে স্মুদ ওভারব্রিজ তো আর নেই। এতদিন বাদে এসছিস, এই বুড়ো শহরটার ঘ্রাণ নে বুঝলি, ঘ্রাণ নে।" উপরি জ্ঞান দিয়ে, পিয়ালী ফোনটা কেটে দিলো। অগত্যা আবার আমার হাত গোনার পালা শুরু, কখন তিনি দেখা দেন!
আমি বুঝতে পারছিলাম, কফি শপের দোকানদার-লোকটা অনেকক্ষণ ধরে, আমাকে বেশ সিম্প্যাথী নিয়ে দেখছিলেন। দুটো কফি শেষ, এটা তিন নম্বর চলছে, এটাও প্রায় শেষের দিকে। ভদ্রলোক নির্ঘাত ভেবেছেন, প্রেমে লেঙ্গী খাওয়ার ফল! বন্ধু ও যে লেঙ্গী দেয়, সেটা তো আর ওনার জানার কথা নয়।
"মে আই শেয়ার প্লীজ?", এয়ারপোর্টে আবার খুঁজে পাওয়া সেই চেনা গলা! খুব অবাক হয়ে তাড়াতাড়ি কফি ছেড়ে, মাথা তুললাম,
" আরে.... তুই! এখানে? মানে কি করে?"
প্রচন্ড তাচ্ছিল্য ভরা হাসি হেসে বলল, "মানে টা কি বস? এটা আমার শহর। আমার যেখানে খুশি যাওয়ার রাইট আছে।"
-তা নিশ্চয়ই আছে; কিন্তু তোর তো আবার সাহেবিয়ানা বেশি পছন্দ কিনা! এখন কোথায়?
-ওরে, পাগলী। সব প্রশ্ন কি আমায় দাঁড় করিয়ে রেখেই করবি?
মনে মনে ভাবলাম, পাগলি বলে যে তুই আর কত্ত বছর ডাকিসনা, সে বোধহয় আমি নিজেও ভুলে গেছি। উত্তেজিত হয়ে বললাম,
-ওহ। অ্যাম সো সরিয়ে, প্লিজ বস...
-তারপর, ম্যাডাম কি এখানে শপিং?
-দুর শপিং। পিয়ালীকে মনে আছে তোর?
-পিয়ালী? বাংলা ডিপার্টমেন্ট? ওবাবা... ওকে মনে থাকবেনা? রেজাল্ট বেরোনোর দিন দু নম্বর কম বলে সে কি কান্না....
-হা হা হা হা। হমমম্! সেই পিয়ালীর জন্য ই অপেক্ষা করছি।
- ইউ মিন ডেটিং?
- মমম্। হা হা হা হা, কাইন্ড অফ... মমমম্ অ্যান্ড ইউ?
- আমিও ঐ! মমমম্ ডেটিং!
খুব জানতে ইচ্ছে করছিল, সে কি আমার থেকে বেশি সুন্দর! একটু চুপ থেকে বললাম,
- ভালোই হল আজ তাহলে আলাপ টাও হয়ে যাবে।
-ফর সিওর। আরে এইইইই... তোর ঘড়ি টা সেই টা না?
বলেই হাত টা টেনে নিয়ে বলল, আরে এখনও এক ই রকম আছে তো! অবশ্য তোর যত্নের কাছে ভিন্টেজ ও হার মানবে।
-বাজে বকিসনা তো। ওসব আমার অবসেশন।
-কিন্তু দাঁড়া, দাঁড়া...পাগলি এটা কি? এতো চলে না। বন্ধ। এটা পড়েছিস কেন?
- তুই জোর করে সময়কে বন্ধ করে দিলেই বুঝি সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়? লাস্ট ফিফটিন ইয়ার্স, এটা আমার সাথে এভাবেই জড়িয়ে। সমস্ত কিছুর একমাত্র সঙ্গী। তুই সেদিন হাইয়ার স্টাডিজের জন্য ক্যানাডা চলে গেলি তোর দাদার কাছে, সাত পাঁচ ভাবিসনি।আমার কথা তো ভাবিসইনি। সেদিন সত্যিই মনে হয়েছিল সময়টা থমকে গেলো। সারাজীবনের মতো। সঙ্গী ছিল শুধু এই তোর দেওয়া ঘড়ি টা। পনেরো বছর ধরে, বারবার, ও আমাকে সেদিনের সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া মুহূর্ত টার খেয়াল করিয়ে দেয়।সুমন, তুই আমাদের সব গল্প ভুলে গেলেও আমার কাছে আজ ও সব টাটকা।
সুমন স্ফীত হাসি হেসে, পকেট থেকে মোবাইল ফোন টা বের করে একটা ফোন করতে লাগে। ওর এই আচরণ দেখে আমার খুব মনে হল, আমি বোধহয় একটু বেশিই ছেলেমানুষি করে ফেললাম।
-আরে তোমার আর কতো দেরি? আর কতো কি কিনবে? আমি ফুড কোর্টে, তুমি তাড়াতাড়ি আসো।
-সরি, আমি বোধহয় একটু বেশিই ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম, আই মিন...
-ইটস ওকে রূপ। তোর এগুলো বলার অধিকার আছে। আমিও সেদিন...
হেই সুমান। তুমি এখানে! দেখো কতো কি কিনেছি। আই জাস্ট লাভ দিস ম্যান।
একটু দূর থেকে, ফিনফিনে এক পুরুষ কন্ঠ ভেসে এলো।
- হি ইস মাই নেফিউ, সূর্য। ওয়েন হি ওয়াজ ফাইভ, দাদা বৌদি একটা অ্যাক্সিডেন্টে...
(দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে) সিন্স দেন আমার সাথেই। এই প্রথম ওর কলকাতা আসা।

No comments:
Post a Comment