আবার আর একটা পুজো চলে এলো। পুজো এবারে একটু দেরি করেই। তাই হাতে সময় আছে ভেবে ঘরদোর আর পরিস্কার করার তাড়া ছিল না। তার উপর পরীক্ষার খাতা দেখার চাপ ছিল। প্রিন্সিপাল ম্যাডামের হুকুম দশ তারিখের মধ্যেই সব খাতা দেখা শেষ করে মার্কশিট রেডি করে দিতে হবে।
আর দুদিন পরই ষষ্ঠী। সত্যি! এই পুজোর সময়টা কলকাতা নগরী যেন হয়ে ওঠে এক রূপ নগরী। আলো আর বাদ্যিতে গোটা শহরটার মধ্যেও যেন হয় এক অদ্ভুত প্রাণ সৃষ্টি। তবে আজ আমি নিজের কাছে এক্কেবারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ -- এই ঘর দুটো পরিস্কার করা আজ শেষ করবোই করবো। ঘরদোর এর সাজগোজ বদলালে মনটাও ক্ষাণিকটা বদলায়। নাহলে তো ছুটির দিনগুলোতেও বেচারা মন ও আটকে পড়ে থাকে সেই এক ই গহ্বরে--- গল্পের বই,
নিউজপেপার নতুবা পুরোনো গান, আর কিছু ই ভালো না লাগলে অবচেতন মনে স্মৃতির তোরোঙ্গ খানার নাড়াচাড়া করাই কাজ। আর সব শেষে পড়ে থাকে ঘুড়ির ল্যাজের মতো সেই হতভাগা দীর্ঘ নিঃশ্বাস!
নিউজপেপার নতুবা পুরোনো গান, আর কিছু ই ভালো না লাগলে অবচেতন মনে স্মৃতির তোরোঙ্গ খানার নাড়াচাড়া করাই কাজ। আর সব শেষে পড়ে থাকে ঘুড়ির ল্যাজের মতো সেই হতভাগা দীর্ঘ নিঃশ্বাস!
পুচকি আজ সারাদিন যেভাবে আমাকে সাহায্য করল, তা সত্যিই বলে বোঝানো যায় না। মুখ থেকে কথা খসার আগেই সমস্ত কিছু জোগাড় করে দেওয়া কি অত ই সহজ? তাই আজ আমরা দুজনায় ঘি-আলুসিদ্ধ-ভাতে দুপুরে চড়ুইভাতি সারলুম। পুচকি হলো পারুলের মেয়ে, বছর দশেক বয়েস। পারুলের ইচ্ছে মেয়ে যেন বড় হয়ে আমার মতো দিদিমনি হয়ে অভাবের সংসারে মুখ উজ্জ্বল করে। আপাতত ছুটির দিনে পুচকির রোজনামচা বাঁধা আমার বাড়িতে। সকালে দুজনে মিলে ঘর পরিস্কার, আর সন্ধ্যেবেলায় -- মাথা পরিস্কার, মানে পড়াশোনা। সারাক্ষণ এতো "মাসিমাসি" বলে মেয়েটা গায়ে লেপটে থাকে, যে ওকে ছাড়া আমার শনি-রবিবার গুলো আর ভাবা দায়।
--"মাসি, ও-ও মা-সি। মাসি। দেখো এটা কি সুন্দর। এটা কি গো?"
আমি তখন আমার সাধের ছোট্ট লাইব্রেরীটাকে ঝারপোছ করতে ব্যস্ত। উপরের তাকের সমস্ত বইতে এক্কেবারে ধুলোর প্রলেপ পড়ে গেছে। কতদিনের সব জমানো বই -- আমার বাবার লেখা কিছু পুরোনো বই ও পেলাম খুঁজে বেশ অনেক দিন পর। উইপোকারা তাদের ওপর বেশ সদয়। বই গুলো এখনও জীবিত আছে। আমার কলেজে পড়ার সময়ের সেই ডায়েরি, লুকিয়ে লুকিয়ে না জানি কত কবিতা সেখানে লিখেছি। অনেক দিন পর এসব খুঁজে পেয়ে মন যেন আলাদিনের গুহা খুঁজে পেয়েছে।
--- "মাসি, কিগো। কখন থেকে তো তোমাকে ডাকছি! "
-- ওহ! হ্যাঁ। বল সোনা, খেয়াল করিনি রে মা।
--- মাসি এটা কিগো?
-- এটা তুই কোথায় পেলি?
ওটা ওর হাতে অকস্মাৎ দেখে নিজের আবেগকে একদম বেঁধে রাখতে পারিনি। ওটা ওর হাত থেকে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে পরোখ করছিলাম, না জানি কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, আর সাথে বুকে বাসা বেঁধে আছে মনখারাপ আর অভিমান।
--- "মাসি, কিগো। কখন থেকে তো তোমাকে ডাকছি! "
-- ওহ! হ্যাঁ। বল সোনা, খেয়াল করিনি রে মা।
--- মাসি এটা কিগো?
-- এটা তুই কোথায় পেলি?
ওটা ওর হাতে অকস্মাৎ দেখে নিজের আবেগকে একদম বেঁধে রাখতে পারিনি। ওটা ওর হাত থেকে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে পরোখ করছিলাম, না জানি কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, আর সাথে বুকে বাসা বেঁধে আছে মনখারাপ আর অভিমান।
অভিমন্যুর ছেলেমানুষি গুলো আজও ভীষণ টাটকা। সবকিছুতেই ভীষণ বেপরোয়া। সংসার জীবনে যে এত দায় সারা হতে নেই সে কথাটা কোনও দিন ওকে বোঝাতেই পারলাম না। অগত্যা, শুধু মাত্র সংসারটাকে একটু ভালোভাবে দাঁড় করাবার তাগিদে সব ছেড়ে চলে এলাম এই সুদূর কলকাতায় একটা লেকচারারের চাকরি নিয়ে । ছোট ছেলে আর বরকে রেখে এলাম শাশুড়ি মা'র জিম্মানামায়। মন মানেনি; তবু সব আবেগকে পোষ মানিয়ে কলকাতাতেই চাকরিটা করছিলাম। হঠাৎ একদিন শাশুড়ি মার ফোন --- বাপছেলে মিলে নাকি আমাকে কি সারপ্রাইজ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। তবে সেটা কি, তা তক্ষুনি নাকি বলা যাবে না। আমি ও মনে মনে ভাবলাম, তবে বসেই থাকি আমার যাদুকর টির জন্য -- দেখা যাক কি চমক এবার দেখায় সে!
দিনটা ছিল শনিবার। সবে ঘুম থেকে উঠে বিকেলের চা-টা নিয়ে বসেছি বারান্দায়, ফোন এলো। ফোনের ওপাশ থেকে যা শুনলাম তাতে আর বেশিক্ষণ মাথা কাজ করবার কথা নয়। শরীর প্রায় ঢলে আসছিল; কোনও মতে কাঁধে ব্যাগটা চাপিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম ফোনে শোনা ঠিকানায়।এক কথায় বিবরণ করার মতো আর কিছুই বেঁচে ছিল না। চারিদিকে পুলিশ, ফটোগ্রাফার, গুঁড়ো কাঁচ, আর মাঝখানে চকের গন্ডি আঁকা দাগের মধ্যে শুয়ে আছে আমার নিস্তেজ রোহন আর অভিমন্যু। ছবির মতো পরিস্কার হয়ে গেলো আমার যাদুকরের 'চমক'।
সমস্ত ফরমালিটিসের শেষে পুলিশ অফিসার আমার হাতে তখন তুলে দিয়েছিল এই বাক্সটা। লাল রাংতার কাগজে মোড়ানো একটা চার ইঞ্চির বাক্স। রোহনের পকেটে নাকি ওটা ছিল। বোধহয় ব্যাগেই রেখেছিলাম ওটা। কিন্তু তারপর আর মনে করতেই পারিনি কোথায় রেখেছিলাম। কত খুঁজেছি, কত কেঁদেছি, তবু হদিস পাইনি। আজ পনেরো বছর হয়ে গেলো। এরকমই একটা পুজোর ছুটিতে ওরা আমার কাছে আসছিল লাল রাংতায় মোড়ানো মুহুর্তের আনন্দ নিয়ে, আমাকে চমক দিতে।
লাল রাংতার মোড়কটা খুলতেই ভীতর থেকে উঁকি দিলো একটা ছোট্ট দেশলাই বাক্স। একটু অবাক হয়েই কোনো দিশা না পেয়ে ঠেলে খুললাম বাক্সটা। বাক্সের মধ্যে দেখতে পেলাম একটা ছোট্ট চিরকুট গুঁজে ঢোকানো। তাতে লেখা---
"সোনামনি মা। বাবা এখন একদম গুডবয় হয়ে গেছে। বাবা আমাকে প্রমিস করেছে তোমার সব কথা শুনবে। আর আমিও। আমরা তোমায় খুব ভালোবাসি। প্লিস ফিরে চলো মা। আমরা তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। ইতি তোমার রোহান। "
"সোনামনি মা। বাবা এখন একদম গুডবয় হয়ে গেছে। বাবা আমাকে প্রমিস করেছে তোমার সব কথা শুনবে। আর আমিও। আমরা তোমায় খুব ভালোবাসি। প্লিস ফিরে চলো মা। আমরা তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। ইতি তোমার রোহান। "

No comments:
Post a Comment