Thursday, 17 September 2020

||হনিমুন||

তথাগত- ও বাবাহ। খুব মন দিয়ে প্যাকিং চলছে দেখছি!
সুপর্না- আরে:, তুমি কখন এলে? ডাকোনিতো। 
তথাগত-(জড়িয়ে ধরে) পিছন থেকে তোমায় দেখছিলাম।কেমন বড় বড় স্যুটকেস একাই হ্যান্ডেল করো। মুনসঙের হোটেলেও তো তোমায় আমাকে একাই হ্যান্ডেল করতে হবে... তাই ভাবছিলাম.. 
সুপর্না- ইসস। কিছুই মুখে আটকায়না, না? বিয়ের দেখা শোনার সময় বাবা বলেছিল ভী-ষ-ণ ভদ্র! ভদ্রতার নমুনা যদি একবার বাবা দেখতো! 
তথাগত- দেখলে বুঝি বিয়ে টা ভেঙে যেতো? আর প্রথম যেদিন তোমাদের বাড়িতে তোমায় দেখতে গেলাম, সেদিন তো খুব আমায় দেখে মুচকি মুচকি হাসছিলে। তার বেলা? 
সুপর্না- তা কী করবো? সামনে সাজিয়ে রাখা মিষ্টি পান্তুয়া ছেড়ে, বাবু যদি শুধু আমাকেই দেখেন, সেটা কি আমার দোষ? 
তথাগত-নাহ।আমার দোষ।অ্যাই শোনো না, ঐ স্লিভলেস টপটা নিয়েছোতো? ঐ রিসর্ট টা কিন্তু দারুণ রোমান্টিক প্লেস। 

(পাশের ঘর থেকে মার গলা) 
অ্যাই বাবু তোদের হোলো? আর কতো দেরি করবি? কাল ভোরে তো ট্রেন। খেয়েনে তোরা। 
( সুপর্না হেসে উত্তর দেয়) 
- হেহে, বেশ হয়েছে এবার। 

তথাগত আর সুপর্নার সবে দশদিন হলো বিয়ে হয়েছে। খবরের কাগজ দেখে সম্বন্ধ করেই বিয়ে। তবে সম্বন্ধ করে বিয়ে হলেও, বিরিয়ানি থেকে পাহাড়, দুজনের পছন্দ গুলো দুজনের সাথেই হুবহু মিলে যায়। যাকে বলে এক্কেবারে মোস্ট কমপ্যাটিবল কাপল। পরিবারে বিয়েবাড়ির রেশ কাটতে না কাটতেই, দুজনে একসাথে হনিমুন কাটাতে গেলো, দার্জিলিং ডিস্ট্রিক্টে মুনসঙ নামে একটি উঠতি পাহাড়িয়া গ্রামে।

দার্জিলিং মেল একদম রাইট টাইমে ঢুকে গেছে NJP ; সেখান থেকে সারে তিন ঘন্টা লাগলো রিসর্টে পৌঁছতে। তথাগত নববধূর মন জয় করতে পাহাড়ের কোলে একটা দুর্দান্ত রিসর্ট বুক করেছে। একদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বুকে সূর্যদয়, আর মাথা নীচু করলেই তিস্তা নদীর অপূর্ব ভিউ। রিসর্ট এর চারিদিকে এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে আছে কত রকমের পাহাড়ি ফুল। গাড়ি থেকে নেমেই, সুপর্না অপরূপ পাহাড়ি সৌন্দর্যকে মোবাইল ক্যামেরায় বন্দী করতে লাগলো। আর অন্যদিকে তথাগত রিসেপশনে বসে রিসর্টের বেসিক ফর্মালিটিস কমপ্লিট করতে লাগল। 

-Sir, I once more confirm, your booking is from 25th to 30th July. As a premium booking, you get the Himalayan cottage, you can enjoy your tea with the mesmerizing Sunrise and a wonderful balcony view of Tista. Apart from that you can enjoy our luxurious gym, bar and massage parlors. Here are your keys.. Your room number is 205.
- Thank you

 -কি ম্যাডাম! পছন্দ? 
- পছন্দ মা-নে??দা-রু-ণ। তথাগত এই হনিমুন টা আমি কোনওদিন ও ভুলবোনা। রিসর্ট টা কি দারুণ না? 
- মমমম.. বলেছিলাম না? আর এদের এখানকার পর্ক স্টেক জাস্ট অওসাম! অনেক রিসার্চ করতে হয়েছে ম্যাডাম। খরচা আছে বলে দিলাম! 
- এখন সব ধারে চলুক। পরে হিসেব মেলাবো। 
( সুপর্না - তথাগত দুজনেই হেসে ওঠে) 

নবদম্পতি প্রেমে এক্কেবারে হাবুডুবু। আর রিসর্ট এর সৌন্দর্য তো উপরি পাওনা। রডোডেনড্রনরা সারা রিসর্ট টাকে যেন পাহাড়া দিচ্ছে। 

আজকের দিনটা মোটামুটি রেস্ট নিয়েই কেটে গেলো। তথাগত ব্যলকনিতে রিল্যাক্স করছে। সুপর্না ফ্রেশ হয়ে সেই পার্পল স্লিভলেস টপটা পরে, তথাগতর কাঁধে মাথা এলিয়ে দিলো।পাহাড়ের পাথুরে গন্ধকেও হাড় মানাচ্ছে সুপর্নার ইম্পোর্টেড পারফিউম। পাহাড়ের বিকেলে তখন ধিরে ধিরে নিঝুম অন্ধকারও গা এলাচ্ছে। তথাগত হাত থেকে উইস্কির গ্লাসটা সামনের টেবিলে রেখে, পৌলমীকে বলল, 
- (নাক দিয়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিয়ে), আহ, তুমি তো দেখছি আজকেই শেষ করে দেবে আমাকে! 
- মশাই, তার আগে তোমার গ্লাসের ঐ তরল পদার্থ খানি তোমাকে শেষ করে দেবে। 
- উফ, তোমার সাথে কথায় আমি পারবোনা। 
- হাহা,আরও অনেক কিছু তেই পারবেনা ডার্লিং। 
- তাই! কৈ দেখাও। একটু পরাস্ত করে দেখাও। শুনেছি, স্ত্রীর কাছে স্বামীরা নাকি পরাস্ত হলে, তার অনুভূতি টা completely incomparable! 
- নাকি? 
-হ্যাকি! 
- তোমার কথায় নেচে এই স্লিভলেস টা পড়ে আমার খুব ঠান্ডা লাগছে। ভীতরে চলো না! 
- আর just দু পেগ খাবো। সত্যিই বলছি। তারপর তোমায় কে ঠান্ডা লাগায়.... আমি দেখছি।
- (haha)ধ্যাত! অসভ্য।
( উত্তরে তথাগত এক কলি গান গায় - "আমার এই বাজে স্বভাব..") 
- উফ, তোমার এই গান... Just killing!! 
- (হেসে) আচ্ছা, আচ্ছা, তুমি যাও,এবার সত্যিই ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি আসছি। 

 সুপর্না কানে হেডফোনটা গুঁজে খাটে একটা বালিশ টেনে হেলান দিয়ে সবে বসতে যাবে, হঠাৎ একটা চার ভাঁজ করা কাগজ, খাটের কাঠের ফ্রেমটা থেকে যেন বেড়িয়ে এলো। অবাক হয়ে কাগজের ভাঁজ খুলতেই, মনে হলো এ যেন কার চিঠি। বেশ কৌতুহল নিয়েই সুপর্না চিঠিটা পড়তে লাগল। 

"কি তথাগত, ভালো আছো এখন? মনের চাপ টা নিশ্চই কমেছে? আগের মতো আর গান গাও? আর এখনও বুঝি কথায় কথায় সেই দুষ্টুমি...থাক, ছাড়ো। চিনতে পারছো আমায়? আমি, তিস্তা। তোমার রাতজাগা জলপ্রপাত! 
জানো, এখন রাত ঠিক ২.৪৫.. তোমার মনে পড়ে, মুনসঙের সেই রাতটা? ঠিক এরকমই আর একটা ২.৪৫...তোমার বন্য আদরে ভরে গিয়েছিল হিল সাইট রিসর্টের এই 205 নম্বর রুমটা। 

   আচ্ছা, এখানকার পাহাড়ের পূর্নিমা চাঁদের কথা মনে পড়ে তোমার? ব্যলকনিতে দাড়িয়ে ঐ চাঁদনী আলোতে কতোবার যে আমাকে পাগলের মতো "ভালোবাসি তোমাকে" বলেছো, সাথে অন দ্য রক্স...আমার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়েছো তোমার চুমুতে বারবার...fire place এর আগুন টা ধিকধিক করে জ্বলেছে সারা রাত, সারাটা শরীর মন জুড়ে...
তথাগত, জানো, আমি আজও পাহাড়ে... আজও সেই 25সে জুলাই, সেই পাহাড়ের পূর্নিমা চাঁদ, সেই পাইনের শিরশিরানি হাওয়া, রাতজাগা পাখির ডানা ঝাপটানো, সবটাই এক ই আছে, শুধু, তুমি নেই, তোমার দেওয়া কথারা নেই, তোমার গানের সুরের উষ্ণতা নেই,  
আর আমি..."
(চিঠি পড়ার মাঝখানেই তথাগতর গলার আওয়াজ শোনা যায়) 
- এই সুপর্না তাড়াতাড়ি একবার ব্যলকনিতে এসো। তিস্তাটা চাঁদের আলোয় কি ভালো লাগছে দেখবে এসো! 
- (ভেতর থেকে ক্রন্দন সিক্ত গলায় সুপর্না উত্তর দেয়) আমিও তো তিস্তাকেই দেখছি। মনে হচ্ছে চাঁদের এ-ক-দ-ম কাছে আছে। 

(গান : লালন সঙ বাই ঝিমলি) 

Sunday, 23 August 2020

||অভিমান||

-- "মোটা ধুমসি মাগি! এক্কেয়ারে নচ্চার মেয়েছেলে। লজ্জা করে না, আপিসের নাম করে রোজ রোজ, রাত করে করে বাড়ি ফিরিস?"

ঘড়িতে ৯.২০। আর আমার দাঁড়িয়ে থেকে ঝগড়া করার সময় বা ইচ্ছে কোনও টাই  নেই। এর পর দেরি করলে মর্নিং মিটিং মিস করবো। তা ছাড়া, ডিভোর্সের পর থেকেই এই রাত করে বাড়ি ফেরা নিয়ে, পরিবার হোক বা প্রতিবেশি, সকলেই বিষয়টা অনুবিক্ষণ যন্ত্রের নীচে ফেলে কাটা-ছেঁড়া করে আমার ব্যাপারে নিজের মনের মতো এক-একখান আস্ত পান্ডুলিপি তৈরি করে ফেলেছে। একমাত্র এই মানুষটাই আমাকে তুলোর মতো আগলে রাখতো, সবার অলক্ষ্যে ফেলা চোখের জল মুছিয়ে দিতো।
--"কিন্তু যেদিন থেকে সৌম্য আমার জীবনে এসেছে, সেদিন থেকে তুমিও সবার মতো হয়ে গেছো। "
চোখ আর ছলছল করেনা; শুকনো মরুভূমি হয়ে গেছে। সব কথার উত্তরও আর দিতে ইচ্ছে করে না। ভীতরের অন্ধকূপটার ব্যাস দিনদিন শুধু বেড়েই চলেছে।

আজও সারে ন'টার আগে বেড়োতে পারলাম না।প্রশান্ত্ আমার বানানো রেভিনিউ  এক্সপ্যানশন মডেল চোখের সামনে নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে সিইও-র কাছে নাম কুড়োলো। বিষয়টা আমি কিছুতেই গিলে নিতে পারছিলাম না। মেইল টা আমাকে সিইও কে করতেই হতো। এই প্রথমবার সিইওকে লেখা কোনও মেইলে আমি প্রশান্ত্ কে মার্ক করলাম না।

বাড়ি ঢুকে দেখি ঘরটা অন্ধকার। পাখার আওয়াজ পেলাম। দরজা খোলার শব্দ পেয়েও আমায় সারা দিলো না। মনে মনে ভাবলাম, "অভিমান করা তোমার বাপের একার সম্পত্তি নয়।" আর ও একটু বেশি আওয়াজ করে, জানান দেওয়ার জন্যই, ও ঘরে না গিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে এলাম।

মনে হলো যেন এক ঘুমেই সকাল হলো। রাতের খাবার চাপা দিয়ে এখনও টেবিলেই পড়ে আছে। ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে অভ্যাস মতো নীচে জলের বোতল টা দিতে গেলাম। মাপের জল তো, সারাদিনে মাত্র ৭৫০ ml খেতে পারবে। জৈষ্ঠ্য মাসের জ্বলন্ত আবহাওয়ায় ঐ টুকু জলে কি হয়! উপায় তো নেই। তাও কি চুরি করে খায়না? কতদিন হাতেনাতে ধরেছি, কুঁজো থেকে জল চুরি করে খাচ্ছে। তারপর আবার এক প্রস্থ অশান্তি। নীচে এসে আজ একটু অন্যরকম লাগলো। এতো বেলা অবধি তো শুয়ে থাকে না। আমার নাহয় শনিবার, ছুটির দিন। ডাকতে গিয়ে কপালে হাত দিয়ে দেখলাম গা বেশ গরম। তাড়াতাড়ি উইলচেয়ার-টয়লেট টা চেক করলাম, এক্কেবারে শুকনো খটখটে। বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। আর সাড়া না পেয়ে, অ্যাম্বুলেন্স ডাকলাম।

সাড়ে চার ফুটের ফর্সা চেহারাটা আইসিইউ ওয়ার্ডের বেডে শুকিয়ে যেন আরও ছোটো হয়ে গেছে। ডাক্তার আমাকে কোনও কিছুই স্পষ্ট করে বলতে পারলেন না। শুধু এটুকু বুঝলাম ক্যানসারটা আর কেবলমাত্র কিডনিতেই সীমাবদ্ধ নেই। উনি বললেন, সোডিয়াম-পটাসিয়াম লেভেলটা রেঞ্জের বাইরে চলে গিয়েছিল। তাতে নাকি মানুষের মতিভ্রমের মতো কঠোর রোগও হতে পারে এবং ফলাফলস্বরূপ কেউ কেউ কটুকাটব্যও করতে পারে।  ।
-"আপনি তিন ঘন্টা পরে এসে রেজিস্টারে সই করে 'বডিটা' নিয়ে নিতে পারবেন।"
কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমার সেই আদরের দিদা কি করে যেন একটা "বডি"তে পরিণত হয়ে গেলো। অনেক কথা বলা বাকি রয়ে গেল। অনুভূব করলাম, অভিমানটাকে আমি কেমন করে সেদিন রাতে আমার বাপের একার সম্পত্তি ভেবে  নিয়েছিলাম! 

Wednesday, 5 August 2020

||বইবাহিক||

বই পেলে বাঈ ওঠে আমার! কতক্ষণে তা পড়া শেষ হবে, মনের ভিতর রীতিমতো সভা বসে যায়। বাড়িতে যে-ক'টা বই আছে, সব পড়া শেষ। কিলোদরে আজকাল তাই পুরোনো পত্রিকা পড়া ধরেছি। সেদিন খবরের-কাগজের ছেলেটাও রসিকতা করতে ছাড়লোনা, "মাসিমা, বলেন তো রবি ময়রার দোকান থেকে জিলিবির ঠোঁঙা এনেদি।" আমিও ছাড়বো কেন? বললাম, "শোনো বাবা, তুমি কি জানো ঠোঁঙ্গা পড়েও জ্ঞান অর্জন করা যায়!"

বরুণ বাবু পাড়ার লাইব্রেরিটা আঠ বছর খুললেও, পড়ার ভিড় তাতে মোটে নেই। সত্যিই বলতে কি আমার খুব খারাপ লাগে। আমি তাই আগ বাড়িয়ে ঠিক করলাম, লাইব্রেরিয়ানের দায়িত্বটা আমিই নেবো। এতে এক ঢিলে দু'পাখি। বই পড়াও হবে, আর সাথে সংরক্ষণ ও। বরুণ বাবু অসুস্থ। প্রায় শয্যাশায়ী। ওনার ছেলেকে গিয়ে জানালাম নিজের ইচ্ছের কথা। ছেলে শুনে খুব খুশি হলেও, বলল "মাসিমা, তাও একবার বাবার সাথে কথা বলে যান। বাবা এমনিতেও বাইরে আজকাল বেরোতে পারে না। চলাফেরা সম্পূর্ণ বন্ধ। এখন তো মানুষ ভুলতেও শুরু করেছে। আপনি এলে, বাবার ভালো লাগবে। জানেন ই তো, লাইব্রেরী টা অনেক সখ করে বানিয়েছিল।"

মনে মনে ভাবলাম, "এমনি এমনি কি আর বই পাগল হয়েছি? একাকিত্ব যে কি বেয়াক্কেলে জিনিস সে আমি হাড়ে হাড়ে টের পাই! "

বরুনবাবু আমাকে দেখে যে খুব একটা চিনতে পারলেন বলে মনে হলোনা। তবে দেখলাম, লাইব্রেরীর কথাটা ওনার এখনও বেশ ভালোই মনে আছে। লাইব্রেরী বানানোর সূত্র থেকে শুরু করে কিভাবে বই বাছাই করে সংরক্ষণ করতেন সেসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা করলেন। অবশেষে আমার মতে সহমত পোষণ করলেন। লাইব্রেরীর ভার এখন আমার।

মনে মনে খুব আনন্দ নিয়ে, দিন শুরু করলাম। আজ লাইব্রেরীর প্রথম দিন। জানা অজানা কতো পুরনো বই এর গন্ধ শুঁকবো সেই উত্তেজনায় নিজের চশমা খানাও নিতে ভুলে গেছি। বরুণ বাবুর ছেলে সুপ্রকাশ আমাকে লাইব্রেরীর চাবিটা দিয়ে বলল, "মাসিমা, অনেক শুভেচ্ছা রইল।  আপনার মতো শুভাকাঙ্ক্ষী খুব কমই দেখা যায়। "

সকাল থেকে মাত্র একজন এলো লাইব্রেরীতে। সত্যি এই মোবাইলের যুগে সব যেন লাটে উঠেছে। "আচ্ছা, মোবাইলেও কি ওরকম বই এর নির্ভেজাল গন্ধ পাওয়া যায়? বই পড়লে যেন মনে হয় ঐ বই এর লেখক নিজের আতরের শিশি ভেঙে ফেলেছে বই এর ওপর!"

হঠাৎ মনে হলো দু নম্বর তাকের একটা মোটা সাহিত্য উপন্যাসের বই যেন কে জোর করে বন্ধ করে ওখানে গুঁজে রেখে গেছে। বই এর এরকম অযত্ন আমি শুধু মাত্র যে সহ্য করতে পারিনা তা নয়, মনে মনে তাকে বেশ খানিক গাল ও দি। বের করে দেখলাম, একটা চিরকুট গোঁজা বই এর মধ্যে, "চশমা খানা না পরলেই তো পারো। তোমার চোখ দুখানা বেলপাতার মতো চিরযৌবন। কেমন আছো?"

চিঠি খানায়  অনেক খানি অনাবৃত আদিখ্যেতা থাকলেও, শেষ লাইন খানা যেন অনেক দিনের আকাঙ্ক্ষার; কতো দিন যে এই জিজ্ঞাসা শুনিনি তার কোনও হিসেব নেই। আর না শুনতে শুনতে না শোনার অভ্যাস টাই গড়ে নিয়েছিলাম।

বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ব্যাগ গুছোতে গুছোতেও মন আমার তখনও ঐ অচেনা লেখকের অজানা ঠিকানায় পাঠানো চিঠিতে আঁটকা। দরজায় তালা দেওয়ার আগে কি মনে হতে, ঐ চিঠিটা বের করে নিয়ে ব্যাগে পুরলাম।

সারারাত মন খুব ভালো ছিল। কে যেন এক আকাশ তারা, না চাইতেই আমার জীবনে মিশিয়ে দিলো জলরঙের মতো। সকালে এসেই আবার ঐ দু নম্বর তাকের মোটা বই টার খোঁজে এগোলাম। হন্তদন্ত হয়ে খুঁজতে লাগলাম চিঠি। চিঠি নেই! মন টা অদ্ভুত ভাবে ভেঙে গেলো। মনে মনে ভাবলাম, "আমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো? কার না কার চিঠি পড়ে, ভাবছি আমার চিঠি। শুধু ভাবছি না, আবার আশাও করছি আরো চিঠির! বই পড়তে পড়তে আমিও  উন্মাদ হয়ে গেছি দেখছি।" কাল রাতের স্বপ্নে বেশি তারা দেখার ফল আজ দুপুরে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। চোখ খুলে যেন রাখতে ই পারছিনা। এখন অপেক্ষা ঘড়িতে কখন সাড়ে পাঁচটা বাজবে।

"মাসিমা, আমি একটু বেড়োচ্ছি। কিছু প্রয়োজন হলে মালোতি দি উপরে আছে, চেয়ে নেবেন।", সুপ্রকাশের গলা পেয়ে ঐটুকু ক্ষীর ঘুমেরও জলাঞ্জলি! তখনও সোয়া তিনটে মাত্র। দেওয়াল ঘড়ি তে চোখ যেতেই চোখ পরলো দু নম্বর তাকে। মোটা বই এর পাশের চটি বই টা হঠাৎ বেখাপ্পা মনে হলো। উঠে গিয়ে হাতে নিতেই লক্ষ্য করলাম, এক্কেবারে প্রথম পাতাতেই কি যেন পেন্সিলে লেখা , "ভেবেছিলাম উত্তর পাবো। অভিযোগ করছিনা। তবে অভিমান করলাম। এখন তোমার দায়িত্ব।"

সব হিসেব আবার গুলিয়ে গেলো। এটাও কি আগের চিঠির মতোই? নাকি নিছক মনের ভুল। একটা কাকতালীয় মাত্র! বুকের ভিতর টা দূরপাল্লা ট্রেনের মতো দুরদুর করতে লাগল। কিন্তু মনের ভিতরের জমাট বাঁধা প্রশ্ন গুলো যে কিছু তেই হার মানছে না। তাড়াতাড়ি ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে লিখলাম, "এই মুহূর্তে ভীষণ ভালো আছি। ভালো থাকার সব দাওয়াই তো তোমার কলমেই।" বাড়ি ফিরে এসেও নিজেকে মানসিক নিধন না করে পারছিলাম না। জানিনা এই ছেলেমানুষির দায় কতটা।

আজ একটু আগেই পৌঁছে গেলাম। আমি জানি না, তবে মন জানে কেন। দু নম্বর তাকের বই যেন ইশারা করেই কাছে ডেকে নিলো। আজ আবার সেই মোটা বই টার মধ্যেই জোর করে রাখা নতুন চিঠি, "তোমার উত্তরই আমার দক্ষিণা বাতাস। আর তুমি আমার ভালো থাকার দাওয়াই। আজকাল কি আমার জন্যই চশমা পরা ছাড়লে?" চিঠি টা পড়েই ভীষণ লজ্জা পেলাম। সত্যি সত্যিই চশমা টা আজকাল আর পরতে মন চায় না। আমার এই পঞ্চান্নৈ লাজুক মুখের খবর আবার যাতে না পাঁচকান হয়, সে খেয়াল রেখে চশমা খানা ব্যাগ থেকে বের করে চোখে আঁটলাম। আজ কেন বা কিভাবে জানিনা লাইব্রেরীতে সাত জন এলো। সব মিলিয়ে আমার চোখে মুখে মনে এক নতুন রামধনু।

প্রত্যেক দিনের দিনলিপি তে জুড়লো এক নতুন অভ্যাস -- প্রেমে পরা। চিঠি র পিঠে চিঠি।
--"আজ যদি হিসেব করো আমরা কিন্তু ছ'মাস পেরোলাম। আচ্ছা, তোমার দেখা করতে ইচ্ছে করেনা? "

মনে মনে ভাবলাম, "আহা, আবদার কত! "
উত্তরে লিখলাম, "...আর তুমি যদি জোনাকি পোকা হও! আমার রূপলী চুলে কি ধরে রাখতে পারবো তোমায়?"
- "তাই বুঝি প্রমাণ করতে আবার চশমা পরা শুরু করেছো? রূপলী চুলে তোমার রূপ বাড়ে বলে তুমি আমায় জোনাকি পোকা বললে? "
-"ওরে বাবা, ঘাট হয়েছে। সমস্ত টা এখনও বিশ্বাস হয়না কিনা।"
-" যদি আমার হাত ধরে সত্যিই ভালো থাকো, তাহলে সবটাই জানবে সত্যি। "
-"জানিতো। তাইতো বই এর পাতার ভাঁজে তোমাকে রোজ খুঁজি। তোমার গায়ের গন্ধ শুঁকি। মাঝে আর একটা দিন। তারপরই ষষ্ঠী। পাঁচদিন পর ভুলে যাবে না তো? "
- "ভুলে গেলে মনে করিয়ে দিও। অষ্টমীর দিন একটা লাল শাড়ি পড়বে তো? কথা দিয়েছিলে।"

দৈনিক ঐ একখানা চিঠি, আমার বয়স যেন মনেমনে এক্কেবারে কমিয়ে দিয়েছে। এবারের পুজোটা সেই কলেজের দিন গুলোর মতো কাটলো। লাল শাড়ি পড়ার উত্তেজনাটা ছিল চুরান্ত। বাড়ির গেটেই দেখা হওয়া পাড়ার  মহিলারাও তারিফ জানাতে ছাড়লোনা। অনেক বছর পর মন্ডপে সারা সন্ধ্যেটা কাটালাম। সমস্তটাই যেন একটা ম্যাজিকের মতো।

ঘোর কাটলো বাড়ি ফেরার পর। সুপ্রকাশ ফোন করলো, বরুণ বাবু মারা গেছেন, "লাস্ট কার্ডিয়াক টা বাবা আর নিতে পারলো না মাসিমা।"
আমি বুঝলাম আমার ম্যাজিক শেষ। এতদিন বরুন বাবু ছিলেন বলেই লাইব্রেরী টার অস্তিত্ব ছিল। এখন সুপ্রকাশ কি লাইব্রেরী রাখবে? হয়তো বেচে দেবে। তার সাথে বিকিয়ে যাবে আমার সমস্ত অক্সিজেন, আমার জোনাকি পোকা।

শ্রাদ্ধের কাজ মেটার দিন কিছুটা ইতস্ততঃ হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, "সুপ্রকাশ, তোমার বাবার লাইব্রেরী টা নিয়ে কিছু ভাবলে?"
- "মাসিমা, ওটা বাবার খুব সাধের। ওখানে আমি হাত দেবো না। তাছাড়া এখন তো আপনি দেখভাল করছেন। চলুক ওটা যেমন চলছে। "
অনেকটা স্বস্তির আশ্বাস পেলাম।

"পাঁচদিন বলে পনেরো দিন পর দেখা হবে। হয়তো আবার অভিমান করে বসে থাকবে। এখন একটা গোটা দিন লাগবে বাবুর মান ভাঙাতে। ", লাইব্রেরীর জন্য তৈরি হতে হতে আমার মনের মধ্যে অগুনতি জল্পনা কল্পনা চলছে। সুপ্রকাশের থেকে লাইব্রেরীর চাবিটা নিয়েই ছুটলাম দু নম্বর তাকের দিকে। দু নম্বর, তিন নম্বর, চার নম্বর সব ঘেঁটে ফেললাম। কোথাও কোন ও চিঠি নেই। সারা গায়ে ধুলো, চোখে জল, মনের মধ্যে একটাই ভাবনা, "পুজোর লাল শাড়ি পড়ার উন্মাদনা আমাকে নিঃস্ব করে দিলো। জোনাকি পোকা তুমি কোথায়?"
হঠাৎ মনে হলো, এই অভিমান তো আমারই ভাঙানোর দায়িত্ব। চিঠি লিখলাম, "অনেক হয়েছে অভিমান করা। ক্ষমা চাইছি তো। বললে নাতো লাল শাড়ি তে কেমন লাগছিলো? "

"দশদিন কেটে গেছে। আজ ও বললে না লাল শাড়িতে আমায় কেমন লাগছিলো। কাল রাতে ঘুমের ওষুধ খেতে হলো। আমার আকাশের জোনাকি পোকার মতো তারাগুলো সব হাড়িয়ে গেছে। ", ঝাপসা চোখে চিঠিটা কোনও ভাবে লিখে, আজ দুপুরেই লাইব্রেরীর চাবিটা মালোতি  কে দিয়ে বাড়ি চলে এলাম। শরীর টা খুব একটা ভালো লাগছিলো না। বিকেলে সুপ্রকাশ ফোন করলো, "মাসিমা, মালোতি দি বললো আপনি আজ তাড়াতাড়ি চলে গেছেন। সব ঠিকাছে তো?"
-- "নানা, ও কিছু না। ঐ প্রেশার টা দুদিন ধরে একটু ভোগাচ্ছে। শোনো বাবা, আমি, তিন চারদিন এখন যেতে পারবোনা।"
--"আরে বাবা ওসব নিয়ে একদম ভাববেন না। বরং কিছু দরকার হলে আমাকে জানাবেন।"
সুপ্রকাশ ছেলে টা সত্যিই খুব ভালো। আমাকে এতো শ্রদ্ধা করে, যে কি বলব।

সাতদিন হয়ে গেছে লাইব্রেরী যাইনি। যাওয়ার ইচ্ছে টাও যেন হাড়িয়ে গেছে আজকাল। বইপত্র পড়তেও আর ভালো লাগে না একদম। চুপ করে বারান্দায় চোখ বন্ধ করে বসে থাকি। জোনাকি পোকার দল আমার বন্ধ চোখের ওপারে ভিড় করে আসে। আর সেই ভিড়ে আমি হাড়িয়ে যাই অনেক চিঠির সাথে।

--"ও মাসিমা, মাসিমা। ঘুমিয়ে পড়েছেন নাকি? অনেকক্ষন বেল বাজাচ্ছি।"
সুপ্রকাশের গলা। সত্যিই মনে হলো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে দিলাম।
--"সুপ্রকাশ বসো। কি করে যে ঘুমিয়ে পড়লাম.."
--"আরে আমি তো চিন্তা করছিলাম, আপনি অনেক দিন হয়ে গেলো আসছেন না। তাই ভাবলাম একবার খবর নিয়ে যাই। "
--"খুব ভালো করেছো। অন্ততঃ খবর নেওয়ার জন্য ও তো আসা হলো। নাহলে তো সারাদিন বাড়িতে আমি একাই। তুমি ভালো আছো বাবা?"
--"আমরা সব ঠিক আছি। ছেলেটার একটু ঠান্ডা লেগেছে এই যা। মাসিমা, আমি ভাবলাম  আপনি একা, এই বই গুলো তাই দিয়ে গেলাম। সময় কাটবে। "
বলতে বলতেই, সুপ্রকাশের মোবাইলে প্রীতির ফোন ঢুকলো। প্রীতি সুপ্রকাশের বৌ। আমি একটা বই নিয়ে এ পাতা ও পাতা করতে লাগলাম; বোধহয় একটু ভালো থাকার ক্ষীণ আশার বোঝাটা অনেক খানি। হঠাৎ চোখ পড়লো, ২৫ নম্বর পাতায়। পেন্সিলে লেখা সেই পরিচিত হাতের লেখা, "নাহয়, একটু অভিমান করেই ছিলাম। তা বলে দেখা করাটা একদম বন্ধ করে দেবে? লাল শাড়িতে কেমন লাগছিলো তোমার চোখ তোমায় বলেনি বুঝি! " বুকের ভিতরে আবার দূরপাল্লার রেলগাড়ি চলার আওয়াজ। সুপ্রকাশ না গেলে ঠিক করে সেই আনন্দটুকুও চেটেপুটে অনুভব করতে পারছিলাম না।
--"মাসিমা, আমাকে বেরোতে হবে। প্রীতি নীচে ওয়েট করছে। একটু দোকানে যাবো আমরা। "
--"হ্যাঁ হ্যাঁ সাবধানে যাও। আর শোনো কাল থেকে আমি আবার লাইব্রেরী আসবো। তুমি না থাকলে, মালোতি কে বলে দিও চাবিটা আমাকে দেওয়ার জন্য।"


||সম্প্রদান||

(Background এ হাল্কা বিয়ে বাড়ির, শানাই বাজছে)

- আরে কিরে? ধ্যাৎ এতো টেনশন করিসনাতো। 
- এই শোন, তোকে শেষ অবধি বিয়ে করছি বলে, ভাবিসনা তুই আমার মাথা কিনে নিয়েছিস।
- আরে কি মুশকিল। আ- আমি কি করলাম? আমি তো তোর জন্য সেই তখন থেকে প্রবলেম সল্ভ করার চেষ্টা করছি। তোর জন্য আমার এক প্যাকেট...  ইয়ে মানে.. 
- তুই আবার সিগারেট খাচ্ছিস? সৌভিক তুই কি চাস বলতো? 
- আরে, আবার খচে যাচ্ছে! মমমমমমম...  এই শোননা... 
-ভাল লাগছে না বলে দিলাম সৌভিক! 
- তুই আমায় সৌ না বলে পুরো নাম ধরে ডাকলেই না আমার পেটটা কিরকম গুরগুর করে। কিরে... পিউরে.... ইতনা, সান্নাটা কিউরে?
- তুই আমায় পিউ বলে ডাকবিনা।
- হ্যাঁ... আর ঘন্টা খানেক পর থেকে "ওগো শুনছো... " বলে ডাকবো, আমি তো ঠিক করেই নিয়েছি।
- তোর এই ক্যাজুয়াল কথাবার্তা গুলো জাস্ট আমার পোষাচ্ছেনা। 
- আচ্ছা, লেট মি বি সিরিয়াস... পিয়ালী একটা কথা বল...  আমি কি করতাম বল। এই ছোটো ব্যাপার গুলো নিয়ে ডিসকাস করলে আরো অশান্তি বাড়তো। তুই তো আমার মাকে জানিস। একটু Orthodox। তাছাড়া আমরা তো এখানেও থাকব না বল। বেশি ঝামেলা হলে তোর সাথে আমার বিয়ে টাই ভেঙে যেতো। 
- গেলে যেতো। চাই না আমার অমন বর যে নিজের মায়ের কথায় ওঠে আর বসে। 
(দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে, হাল ছেড়ে দিয়ে) 

[পিয়ালীর মামা সৌভিকের ঘরের বাইরে থেকে দরজায় দুবার নক করে জিজ্ঞেস করলো , সৌভিক, এসো...এবার নীচে নামতে হবে। আমি বাইরে আছি। ]
- যাকগে। ছাড়। ফোনটা রাখছি এবার। বাইরে বোধহয় তোর মামা এসছেন। মনে হচ্ছে, পুরুত ডাকছে আমাকে। তুই রেডি হ  তাড়াতাড়ি। 
- ওয়াটেভার। আই অ্যাম নট সিওর।
- ঠিকাছে...দেখে নে সেটা। 

পিয়ালী-সৌভিকের বারো বছরের সম্পর্ক; আজ শুভ পরিনয়। বিয়ের দিনে পিয়ালীর বিধবা মা'য়ের উপস্থিতি নিয়ে সৌভিকের বাড়িতে গত একমাস ধরে রীতিমতো কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলছে।  মা আর প্রেমিকার, থুড়ি হবু বৌ এর বাকযুদ্ধের মাঝে সৌভিকের ক্রমশ বাকরূদ্ধ হওয়ার পরিস্থিতি। অন্যদিকে পিয়ালীর কড়া নির্দেশ , যদি মা ঘুণাক্ষরেও এসব জেনেছেন, তাহলে ঐ মুহূর্তেই বিয়ে ক্যান্সেল! সৌভিক বেচারা এই টানাপোড়েনের হেঁচকি তুলতে তুলতে অতিষ্ঠ। পিয়ালীর ফোনটা রেখেই, সৌভিক একটা ফোন করলো। 
- সব ঠিকাছে তো? কিচ্ছু যেন এদিক ওদিক না হয়, কেস খেয়ে যাবো মাইরি।
দুটান দিয়েই, সৌভিক, সিগারেট টা শেষ হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে মুচরে গুঁজে, পিয়ালীর মামার সাথে নীচে বিয়ের আসরে চলে গেলো। 

পুরুতমশাই অনেক অঙ-বঙ-চঙ বলে চলেছেন ঠিকই, কিন্তু সৌভিকের মাথায় একটাই মন্ত্র চলছে, পিউ প্লিজ এই যাত্রায় আমায় বাঁচিয়ে দে! 
- এবার মেয়েকে নিয়ে আসুন। সাতপাকে ঘুরে, শুভ দৃষ্টি হবে। তার পর মালা বদল। তারপর সম্প্রদান। সবশেষে সিঁদুর দান। 

পুরুত ঠাকুরের কথা শুনেই তো সৌভিকের পিলে চমকে উঠলো। মানে প্রথমে পিয়ালীর রগরগে চোখ, তারপর ভগবান ই জানেন আজ ভাগ্যে কি লেখা আছে! উলুধ্বনির সাথে পিয়ালী কাঠের পিঁড়িতে চ'ড়ে এল। কোথায় রগরগে চোখ!  এতো যেন স্বর্গের অপ্সরী। সৌভিক পিয়ালীকে এই বৌ-বেশে দেখে একেবারে মোহিত হয়ে গেলো। সারাক্ষণ তো জিন্স টপে দেখে, তার উপর, পিয়ালীর মেজাজ এক্কেবারে সপ্তমে থাকে। বন্ধু বান্ধবদের হৈহৈ-হট্টগোলের মাঝে মালা বদল টাও হয়ে গেলো। পুরুতের নির্দেশ মতো ছাদনাতলায় পিয়ালী সৌভিকের বাঁদিকে বসল। বসেই প্রথম প্রশ্ন, (ফিসফিস করে) "did you talk to your parents? "
সৌভিকের মাথায় বাজ। আস্তে করে জবাব দিলো, "এখন বিয়েটাতে মন দে প্লিজ। আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করছি।"
- what do you mean by... 
- আ-আ-স্তে-এ
- what do you mean by একটা ব্যবস্থা করছি? মা কোথায়? কেন দেখতে পাচ্ছি না? 
- আরে (short word) . . . ঊফফ... 
(পিছন থেকে)
বিয়ের সময়টা এত চঞ্চল হতে নেই মা। এখন তো মন দিয়ে বিয়েটা কর, সারাজীবন পড়ে আছে ওর উপর ছড়ি ঘোরানোর... 
-- মা-আ-আ.... তুমিইইইই... 
- পাগলী, তোর বিয়ে, হাতে মেহেন্দী পড়েছি, আর আমিই থাকবোনা, তা কি হয়? নেহ, সৌভিক সড়ে বসতো, আমায় বসার একটু জায়গা দে... ঠাকুরমশাই, এবার সম্প্রদান তো? কৈ শুরু করুন, আমি সম্প্রদান করবো... 
- মা-আ-আ-, are you serious? তুমি যে বলেছিলে ছোটো মামা কর.... 
- (সৌভিক) তুই না just backdated! কেমন গুগলী দিলাম বল! ক্রেডিট ফেডিট কিছুই তো দিচ্ছিস না! তুই তো খালি সিঁদুর দানের সময় কাকিমার presence টা চেয়েছিলি। তোর জন্য আমার কিসব দোষ কাটাতে মা'র গুরুজির জ্বালায় last 2 weeks constant নিরামিষ খেতে হয়েছে। তবে গিয়ে  approval পেয়েছি। বিয়ের পর কবজি ডুবিয়ে বিরিয়ানি খাওয়াবি.... 
- সৌভিক i just love you sss.... 
- আরে  আরে, আস্তে বলললল... 
- না মানে, তোকে পারলে এখনি একটা চু.... 
- ব্যস ব্যস ব্যস! আর না মা আমার.... 
- হিহিহিহি (পিয়ালীর হাসি) 

||হাতবদল||

বাবা-মার উপর বরাবরের রাগ তাতানের। কৈ তারা দিদির উপর তো নিজেদের ইচ্ছে গুলো চাপিয়ে দেয়না! শুধু ছেলে বলে বুঝি এতো দায়িত্বের বোঝ নিতে হবে! এই ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ারের ভবিষ্যতের বাইরে যেন আর কোনও ভবিষ্যৎ ই নেই ওদের কদরে। মাধ্যমিকে ইতিহাসে পঁচানব্বই পাওয়া স্বত্ত্বেও নিজের ছোটোবেলা থেকে দেখা আর্কিওলজিস্ট হওয়ার স্বপ্নকে চোখের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে তাতান। মুখ ফুটে সেদিন রা শব্দটা পর্যন্ত কাটেনি তাতান। বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস তাতানের যে একেবারেই নেই। বাবার গম্ভীর মুখটা দেখলেই মনের ইচ্ছে গুলোও তাতানের সাথে চোর পুলিশ খেলে। আর এদের মাথা থেকে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান এর ভূত নামানোই গেলোনা। ছেলেরা নাকি আর্টস পড়েনা। বাবা-মার এই অতিরিক্ত চাপে তাতানের শ্বাসরোধ হয়ে আসে প্রতি মুহূর্তে। এখন আবার নতুন বায়না, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেই হবে। কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে একদিন সবে বাবাকে বলতে গেলো যে সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায়না, ব্যস, অমনি শুরু হয়ে গেলো বাবার গর্জন... 
-- মনি, তুমি তোমার ছেলে কে বলে দাও এসব বেড়েল্লাপনা এখানে চলবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং ওকে পড়তেই হবে। 
-- উফ! তোমাদের এই বাপ-ছেলের প্রতিদিনের কুরুক্ষেত্র আমার আর ভাল্লাগে না বাপু! বাবু, তোর কি বাবা মার জন্য একটুও খারাপ লাগেনা কখনো? রোজ তোর বাবা, মুখে দুমুঠো গুঁজে ছোটে অপিসে। মানুষটার কথা কি একবার ও ভাববিনা? 
তাতান ভাবে, এদের কিছুতেই বোঝানো যায় না, ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়লেও মানুষ বাঁচে। তাছাড়া, স্ট্যাটিস্টিক্সই যে আগামী দিনের শিরদাঁড়া, সেই বা কে এই বাড়িতে শুনবে। ইলেভেন থেকেই বাগ স্যারের ক্লাসে এই স্ট্যাটিস্টিক্স এর প্রথম প্রেমে পড়া। তাতান এবারে এক্কেবারে decided, আর তার সাধের হাতবদল হতে দেবেনা সে। H. S. পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেরদিন, দিদির কাছে সন্ধ্যেবেলা ছাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক নালিশ করলো। গোটা বাড়িতে এই একটা মানুষ ই যে তাতানকে এতো বোঝে। 
--"আচ্ছা ঠিকাছে বাবা, এখন শান্ত 'হ। কাল প্রথম পরীক্ষা। এই মাথাগরম নিয়ে পরীক্ষা দিলে তো তোর স্ট্যাটিস্টিক্স ও কিস্যু করতে পারবে না। 
---দিদি আমি মরে যাচ্ছি ভিতরে। পারছি না নিতে এতো চাপ। 
--- ওরে পাগল। চুপ করবি? চোখ মোছ, এদিকে আয়...  উফ! কবে বড় হবি তুই? হসপিটাল থেকে তোকে বাবা যেদিন সেই আঠেরো বছর আগে নিয়ে এসছিল, সেদিন ও তুই এতো কাঁদিসনি। 

দুমাস কেটে গেছে। তাতান সকাল থেকেই প্রচন্ড উত্তেজিত। আর কিছুক্ষণ পরেই জয়েন্টের রেজাল্ট বেরোবে। দিদি ঘরে ঢুকে দেখলো, তাতান হাতের নোখ গুলো খেয়ে প্রায় শেষ করে ফেলেছে। 
-- কিরে গরু! তুই তো এমনিতেও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বিনা। তাহলে আবার এতো টেনশন কিসের? 
-- ওফ! ঝামেলা পাকাস নাতো দিদি। 
- হা হা হা হা, শোন ভাই..বাবা মা তোর ভালোই চায় বুঝলি? 

রোল নম্বর টা কম্পিউটারে টাইপ করার সময় হাত কাঁপছে তাতানের। চোখ ছলছল। বুক দুরদুর। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠল রেজাল্ট। চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পরতে লাগলো। দিদি পাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল, "সাবাশ!! ভা-আ-ই...৩২৬ !!" পেরেছে অবশেষে তাতান। চোখ ভরা জল নিয়ে বই এর ভিতর থেকে জেভিয়ার্স কলেজের ফর্ম টা নিয়ে গেলো বাবার কাছে। ফর্ম টা বাবার হাতে দিয়ে বলল, ৩২৬। তাতানের বাবা  TV তে খবর শুনছিল। মুখ সরিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "এটা কি?"
- স্ট্যাটিস্টিক্স থ্রি ইয়ার্স ডিগ্রী কোর্সের ভর্তির ফর্ম। এখন আর নিশ্চয়ই লোকে কি বলবে সেই ভয় নেই! আর এখনও ভয় থাকলে, আমার জয়েন্টের রেঙ্ক টা জানিয়ে দিও তোমার দেশোদ্ধার করা পাড়া-প্রতিবেশিদের। ফর্মে সাইনটা করে রেখো। কালই জমা দিতে হবে। 

||ভেলভেলেটা||

অতিন্দ্র। সালটা 2001 কি 2 হবে। আমাদের থেকে বছর পাঁচেক ছোটো। তখন বোধহয় "অতি" রা ক্লাস সেভেন টেভেনে পড়ে। হ্যাঁ, অতি। ঐ নামেই ওর বন্ধুরা ওকে ডাকতো।  রোজ বিকেল বেলা আমাদের যাদবপুরের ভাড়া বাড়ির সামনে যে ফাঁকা গলিটা, ওখানে পাঁচ ছ' জন বন্ধু মিলে খেলতো। ঐ সময়টা আমি আমার দিদার পায়ে তেল মালিশ করে দিতাম। দিদা সবসময় বলত, 
- "এই ছেলেটা বড় নচ্চার।  ও আবার কি চলনধরন! পাড়া-প্রেতিবেশিদের বাঁচতে দেবে না গা। ছেলে হয়ে জন্মেছিস, কোথায় বংশের বাতি ধরবি, তা না মেয়েলি পনা। আজকাল, দিনকাল বাপু বুঝিনা... "
এক মাথা কোঁকড়ানো চুল, শান্ত স্বভাবের অতিন্দ্র, বেশিরভাগ সময়ই মুখ নীচু করে থাকতো। আসলে, অতির আদব কায়দা আর পাঁচ টা ছেলের মতো তো ছিলনা। চোখে পড়ার মতো বেশ আলাদাই ছিল। কোমর দুলিয়ে হাঁটতো, হাতের ভঙ্গিমাও অনেক তাবর তাবর নৃত্য শিল্পীদের মতো, গলার স্বর ও বাকিদের মতো তখনও পুরুষালি হয়ে ওঠেনি। ওর হাত থেকে বল্ ফসকে গেলেই, ওর বন্ধুরা ওকে "এই মেয়েটা, ভেলভেলেটা" বলে খুব জ্বালাতো। তাও কখনোও অতিকে মুখ খুলতে দেখিনি। বরং মুখ নীচু করে চোখ মুছতে দেখেছি। অনেক সময়ই মনে হয়েছে তাড়াতাড়ি নীচে দৌড়ে গিয়ে, দিদির মতো পাশে দাঁড়াই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, এতো অতির ই দোষ!  ও তো চাইলেই পারে নিজেকে একটু বদলে নিতে। 

একটু বড় হওয়ার পর হঠাৎ একদিন শুনেছিলাম ওর বাবা নাকি ওকে খুব মেরেছে, সে কি চিল্লাচিল্লি। ছেলেটা নাকি ওর বোনের শাড়ি পড়ে বিয়ের কোনে বৌ সাজছিল, আর অমন সময় ঘরে ঢুকে পড়েছে ওর বাবা। তারপর চ্যালাকাঠ দিয়ে মার। আমার এখনও মনে আছে সেদিন সারা দুপুর থেকে সন্ধ্যে আমাদের বাড়ির পিছনের মাঠের মাঝখানে ওর বাবা ওকে খালি গায়ে, শুধু একটা জাঙ্গীয়া পড়িয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। আর স্কুল ফিরতি যত ছেলেপুলে ওর গায়ে রাস্তা থেকে ঢিল কুড়িয়ে মারছিল। আমি আর বিনু, মানে আমার ছোট বোন, ওকে দেখে সেদিন খুব হাসাহাসি করেছিলাম। বিনু তো হাসতে হাসতে বলেও দিলো, দিদি, তুই আমাকে তোর মাধ্যমিকে পাওয়া ঘড়িটা দিয়ে দিলেও ওকে কক্ষনো বিয়ে করবোনা! তারপর শুনেছিলাম অতি নাকি বাঙ্গুরে দুদিন ভর্তি ও ছিল। অত বড় একটা ছেলে, নিজেকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল পুরো শরীর টা ঢাকা দেওয়ার। আর তার সাথে সে কি কান্না! তার কয়েক মাস পরই কানা ঘুষো শুনেছিলাম ওকে নাকি পুরুলিয়াতে কি একটা বয়েজ রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেই কথাটা শুনে দিদা মাকে বলেছিল, "যাক বাবা। ছেলেটার এবার একটা হিল্লে হবে। কথায় আচে, ভগোবান আচেন। সেকি আর এমনি এমনি বলে নাকি গা! "

 যাইহোক, আজ মা'কে নিয়ে monthly check up এ যেমন যাই, তেমন গিয়েছিলাম হসপিটালে। ড: সরকারের কাছে।কদিন ধরেই মা'র প্রেসার টা খুব ওঠানামা করছে। পাল্স টাও বেশ হাই। কিন্তু এবারে ড: সরকারের কথা মোটেই ভালো ঠেকলো না। প্রেশার এর আগে সুগারের রিপোর্ট টা কন্ট্রোল না হলে, অ্যাঞ্জিও টা পর্যন্ত করা যাবেনা। ডাক্তার বাবুর প্রেস্ক্রাইব্ড মেডিসিন নিয়েও সুগারের লাস্ট রিপোর্ট টা ওনার নিজেরই মন মত হয়নি। 

- নাহ, পারমিতা, তোমার মার ওপর আর এক্সপেরিমেন্ট করাটা ঠিক হবেনা। আমার মেডিসিন গুলো মোটেই কাজ করছে না। সে তোমরা আমাকে যতই ভগবান বলো! 
- কিন্তু স্যার, মাতো খাওয়া দাওয়াও আগের থেকে অনেক কন্ট্রোল...
- শুধু কন্ট্রোল করলেই হবে না পারমিতা। রেগুলার ডিটেল্ড মনিটরিং লাগবে। আমি একজন এন্ডোক্রোনোলজিস্ট কে রেফার করে দিচ্ছি। ওনার কাছে এখনও অবধি আমি যাকে যাকে পাঠিয়েছি, সবাই খুব success পেয়েছে।  অতশী is a very serious doctor...তুমি দাঁড়াও, আমি reception  এ বলে দিচ্ছি ফোন করে।
(ফোন তুলে) হ্যাঁ, এই মিলি, শোনো, আমার ঘরে এখন যে পেসেন্ট আছেন ওনাদের আমি একটু ড: মিত্র কে refer করেছি, ওনাদের ম্যাডামের ঘরে কাউকে দিয়ে একটু পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দাও না... Ok. Thank you. 
হ্যাঁ, তোমরা বাইরে মিলির কাছে যাও, ও সব ব্যবস্থা করে দেবে। just don't worry. 

আমরা রুম থেকে বাইরে বেরোতেই রিসেপশনের ঐ মিলি বলে মেয়েটি নিজেই আমাদের দোতলায় মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে নিয়ে গেল। দু নম্বর ঘরের দরজায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা "ড: অতশী মিত্র"... নাম টা দেখেই মনে অনেকটা বল পেলাম। মিলি কে জিগেস করলাম,  "ম্যাডাম কি এম ডি?" 
- ড: মিত্র এখানকার Head of the Department
শুনেই ভরসার মাত্রা টা আরো খানিকটা বেড়ে গেলো। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই আমাদের ডাক পরল। বুঝলাম, ড: সরকার ওনাকে আগেই inform করে দিয়েছেন। নাহলে ওনার ঘরের বাইরে যা ভিড়... 
ঘরে ঢুকতেই, এক মুখ তরতাজা হাসিতে জ্বলজ্বল করছে একটা চকচকে চেহারা; ঘাড় অবধি চুলে চাইনিজ কাট করা, চোখে চশমা, পরিপাটি ভ্রূ, মসৃণ গোলাপি ঠোঁট, হাতের নিখুঁত আঙুল...এত স্নীগ্ধতা, সামনে না থাকলে বোঝানো সম্ভব নয়। 
একটু অধৈর্য হয়েই জিজ্ঞেস করলাম, 
- ম্যাডাম, মানে, কিছু যদি না মনে করেন... আপনি কি...অতিন্দ্র বলে কাউকে চেনেন? যাদবপুরে থাক... 
- হ্যাঁ মিষ্টি দিদি, আমি তোমাদের সবার সেই ছোট্ট অতি। আর বাকিদের কাছে ড: অতশী মিত্র।

||আমার ভিতর ঘরে||

উফ! প্রত্যেক দিন সন্ধ্যে হলেই শহরের মাঝখানে লাগানো  লিপস্টিকের এই অ্যাডটাতে নিজেকে দেখলেই আমার গা ঘিনঘিন করে ওঠে। আসা যাওয়ার পথে প্রত্যেক দিন নিজের বিরাট ছবি টা মনে হয় যেন আমায় গিলে খেতে আসছে। সূর্যাস্তের পর, প্রতি দিন হোটেল বেডরুমের কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে, আমারই ছবিতে সাজানো ঐ নিওন আলো গুলো গোটা ঘরে যখন উছলে পড়ে, মনে হয়....মনে হয় এক ঝাপটায় সব শেষ করেদি। শহরের সব পুরুষদের হার্টথ্রব আমি - এই পল্লবী। কিন্তু আমার ঐ পুরু মেকাপের তলায় লুকোনো, বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা চাপা-কান্নার কথা...কে জানে??? কেউ চেষ্টা ও করেনি জানার! সেই কোন ছোটবেলায় প্রেমে পড়েছিলাম একদিন। প্রেমে পড়ার বোকামির ঋন তো আমি আজও গুনছি। মাত্র ঊনিশ বছর বয়েসেই, আমার মা হওয়া। তখন থেকেই আমার  সেই লাল-গড়ানো প্রেমিকটা ভোকাট্টা! বাবা-মা ও "লোকে কি বলবে" ভেবে ঘরছাড়া করে দিল। আমার দোষ, একটাই....শুধু একটু বাঁচতে চেয়েছিলাম। বাঁচতে চাওয়ার মাশুল তাই আজও গুনছি যে।
(হোটেল রুমের ফোনটা বেজে উঠলো)
- গুড ইভনিং মিস পল্লভী, আই অ্যাম কলিং ফ্রম দ্য রিসেপশন। ইউ হ্যাভ অ্য গেস্ট ...মিস্টার চাতুর্ভেদি। ডু আই সেন্ড হিম আপস্টেয়ার্স?
(চোখের জল মুছে নিয়ে) ইয়েস প্লিজ ডু। থ্যাংকস।
- ইউ আর ওয়েলকাম ম্যাম।
*****
*****
প্রত্যেক দিন সন্ধ্যে হলেই আমাদের ব্যালকনি থেকে ঐ দূরের বিজ্ঞাপনের কি বিরাট সাইনবোর্ড টা...আমার যে তাকিয়ে থাকতে কি ভালো লাগে...। সারাক্ষণ, ঐ রঙিন আলোয় সাজানো, পুরু লিপস্টিক পড়া ঠোঁট দুটো ...আর গাঢ় কাজল লাগানো চোখের মডেলের চাউনি, ওফফফ... মনে হয় যেন আমাকেই ডাকছে। আমার এই সাদামাটা জীবনের থেকে একদম আলাদা... যেমনটা, যেমনটা আমি সবসময় চেয়েছিলাম। যেন একটা স্বপ্নর মত!!!! সত্যিনা, ঐ মডেল  আজ কি successful; ওর বিজ্ঞাপন দেখতে গেলেও গোটা শহরকে মাথা উঁচু করে দেখতে হয়। কলেজে পড়াকালীন খুব ইচ্ছে ছিল এইরকম মডেল হওয়ার। কিন্তু মধ্যবিত্ত ঘরের বাবামা এই সব তকমার মূল্য বোঝেইনা! তো পড়াশোনা শেষ, আর বৈবাহিক জীবনের শুরু। তবে আমার নতুন সংসার নিয়ে কোনোও ক্ষোভ নেই। বাবা মার পছন্দের বর খানা এক্কেবারে আদরে-আবদারে মাথায় তুলে রেখেছে। চাইলেও কোনও অভিযোগ করতে পারবো না। সারাক্ষণ শুধু অনন্যা.... আর, অনন্যা। যেন আমাকে চোখে হারায়।

(ভিতরের ঘর থেকে আওয়াজ আসছে)
-অনন্যা, অনন্যা.... তুমি কোথায়?
ঐ দেখো তুমি এখানে! আর আমি....
(একটু থেমে গিয়ে) কিগো? কি ভাবছো?
-কই নাতো
- মমমম্, আমাকে বলবে না তো...বলো বলবে না (বর খুনসুটি করতে থাকে)
- হাহাহা, ঈশ! কি হচ্ছে টা কি? ছাড়োওওওও...সবাই দেখছেতো...
-দেখুক। আমি কি অন্যের বৌ এর সাথে প্রেম করছি?? আমার নিজের বি-য়ে করা বৌঔএটাআআআ...
-হা হা হা, ধ্যাৎ (voice will fade off)

তবু সব আনন্দের মধ্যেও মডেল হওয়ার সুপ্ত আবেগখানি কিছুতেই আমি মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনা। না জানি কত লক্ষ-লক্ষ তারা মাখা স্বপ্ন, নাম-যশ-খ্যাতি স-ব-ব লুকিয়ে আছে ঐ মসৃণ চেহারার পিছনে!